ঢাকা, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৪ আশ্বিন ১৪৩৩, ০৬ রবিউস সানি ১৪৪৮

বন্ধু ভেবে ৩০ বছর, ডিএনএ টেস্টে মিলল ভিন্ন তথ্য

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৩:৫৫, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বন্ধু ভেবে ৩০ বছর, ডিএনএ টেস্টে মিলল ভিন্ন তথ্য

ছবি: সংগৃহীত

কখনো কখনো জীবনের কিছু গল্প শুনলে মনে হয়, যেন সিনেমার কাহিনি। অবশ্য বেশির ভাগ সিনেমাই বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে তৈরি হয়। কিন্তু কখনো কখনো বাস্তবতা কল্পনাকেও হার মানায়। মিনা গেলটিঙ্ক ও মিনাল টিজেনের জীবনের গল্পও তেমনই এক সিনেমাটিক ঘটনা।

আশির দশকে ভারতে জন্ম মিনা গেলটিঙ্ক ও মিনাল টিজেনের। জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই মুম্বাইয়ের দুটি অনাথ আশ্রমে ঠাঁই হয় তাঁদের। সেখান থেকে তাঁদের দত্তক নেয় নেদারল্যান্ডসের দুটি পরিবার। কাছাকাছি এলাকায় বড় হলেও নিজেদের পরিচয় সম্পর্কে জানার কোনো সুযোগ হয়নি তাঁদের।

দুই বোনের কিশোর বয়সে তাঁদের দত্তক দেওয়া প্রতিষ্ঠান একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানেই প্রথমবারের মতো একে অপরকে দেখেন তাঁরা। নিজেদের মধ্যে অদ্ভুত মিল দেখে দুজনই অবাক হয়ে যান।

সেদিনের স্মৃতিচারণ করে মিনা বলেন, ‘দত্তক নেওয়া শিশুদের নিয়ে একটি আয়োজন হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল একসঙ্গে সময় কাটানো, পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং রাতের খাবার খাওয়া।’

অনুষ্ঠানে মিনা ও মিনাল দুজনের সঙ্গেই তাঁদের বন্ধুরা ছিলেন। তাঁরাই প্রথম খেয়াল করেন, দুজনের মধ্যে বেশ মিল রয়েছে। তাঁরা দুজনকে আয়নায় নিজেদের দেখতে বলেন।

মিনা বলেন, ‘তখন আমি বললাম, হায় ঈশ্বর! ওর নাকটা তো আমার মতো! আমাদের হাসিও একই রকম।’

রাতের খাবারের সময় পুরোটা সময় মিনালের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন মিনা। পরদিন দুজন নিজেদের ফোন নম্বর ও ঠিকানা বিনিময় করেন।

সে সময় তাঁদের কারও মনেই নিজেদের মধ্যে রক্তের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি আসেনি। তবু প্রথম দেখাতেই দুজনের মধ্যে একধরনের গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। এরপর বছরের পর বছর একে অপরকে চিঠি লিখেছেন তাঁরা। এমনকি চিঠিতে একে অপরকে ‘বোন’ বলেও সম্বোধন করতেন।

চিঠিতে স্কুলের গল্প, বন্ধুদের কথা, বেড়াতে যাওয়া, নাচ শেখা, খেলাধুলা ও গান নিয়ে কথা বলতেন তাঁরা। একপর্যায়ে জানতে পারেন, দুজনেরই প্রিয় ব্যান্ড ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ।

বছরের পর বছর এভাবে চিঠি বিনিময় চললেও একসময় তাঁদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মিনাল ফ্রান্সে চলে যান। আর মিনা সদ্য মা হওয়ায় সন্তান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

তবে জীবন যেন তাঁদের সম্পর্ককে একটি অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রেখেছিল। ২০১৭ সালে ভারত থেকে দত্তক নেওয়া ব্যক্তিদের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন মিনা। সেখানে ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়ে জানতে পারেন তিনি। শেকড়ের সন্ধান পেতে ডিএনএ পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পরীক্ষার ফল তাঁকে নিরাশ করে।

এরপর কেটে যায় আরও কয়েক বছর। গত ২০ মে মিনার ফেসবুকে মিনালের একটি বার্তা আসে। তাতে লেখা ছিল, ‘আমাকে মনে আছে?’

এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে ১৫ বছর। কিন্তু সম্পর্কের সেই টান আবারও তাঁদের কাছাকাছি নিয়ে আসে।

এপ্রিল মাসে নেদারল্যান্ডসে নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে মিনালও ডিএনএ পরীক্ষা করেছিলেন। ফেসবুকে পাঠানো বার্তার সঙ্গে সেই পরীক্ষার ফলাফলও মিনাকে জানান তিনি।

মিনা যে অ্যাপের মাধ্যমে ডিএনএ পরীক্ষার ফল পেয়েছিলেন, সেটিতে আবার পরীক্ষা করে দেখেন। ৪৩ বছর বয়সী মিনা বলেন, ‘আমি অ্যাপটি আবার ইনস্টল করলাম। এতটাই নার্ভাস ছিলাম যে লগইন করতে গিয়ে ১০ বার ভুল পাসওয়ার্ড দিয়েছিলাম। এরপর দেখলাম, পরীক্ষার ফল বলছে, দুজনের ডিএনএ ১০০ শতাংশ মিলে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। মিনাল ছিল আমার জীবনের সেই হারানো অংশ, যার জন্য আমি এত দিন অপেক্ষা করছিলাম। আমরা একে অপরকে বোন বলে ডাকতাম। এই ডিএনএ পরীক্ষার ফলই নিশ্চিত করল, আমাদের এত দিনের টান আসলে ঠিক ছিল।’

‘মনে হলো ঘরে ফিরে এসেছি’

আগস্টের এক সুন্দর রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে দুই পুরোনো বন্ধু প্রথমবারের মতো বোন হিসেবে দেখা করেন। তিন সন্তানের মা মিনা বলেন, ‘অসাধারণ অনুভূতি ছিল। মনে হলো, ঘরে ফিরে এসেছি। বছরের পর বছর মিনা আর আমি বড় শূন্যতা অনুভব করেছি। এখন মনে হচ্ছে, সেই শূন্যতা আর নেই। সবকিছু ঠিক আছে এখন।’

প্রথম দেখায় তাঁরা একসঙ্গে প্রথমবারের মতো সেলফিও তোলেন।

৪৪ বছর বয়সী মিনাল এখন ফ্রান্সে তাঁর সঙ্গী ও দুই ছেলেকে নিয়ে থাকেন। এপ্রিল মাসে ডিএনএ পরীক্ষার ফল হাতে পাওয়ার পর প্রথমে তিনি বুঝতেই পারেননি, ৩০ বছর আগে প্রথম দেখা হওয়া সেই কিশোরীই তাঁর বোন। সেই মেয়েটি দেখতে ঠিক তাঁর মতোই ছিল এবং যাকে তিনি বন্ধু বানিয়েছিলেন।

পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিনার অ্যাকাউন্ট খুঁজে বের করেন মিনাল। সেখানে মিনার ছবি দেখার পর বিষয়টি তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়। মিনা তাঁর বোন—এটি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না তিনি।

মিনাল বলেন, ‘আমরা বন্ধু ছিলাম। কিন্তু পুরো সময়টায় আমরা বোনের মতোই ছিলাম, শুধু আমরা জানতাম না যে আমরা বোন।’

মিনা জানান, নেদারল্যান্ডসের একটি ছোট গ্রামে তাঁর বেড়ে ওঠা। তাঁর দত্তক বাবা-মা একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। কয়েক বছর আগে তাঁর বাবা মারা গেছেন। তবে মা এখনো সেই একই গ্রামে থাকেন।

২০০৩ সালে ১৯ বছর বয়সে মুম্বাইয়ের সেই অনাথ আশ্রমে গিয়েছিলেন মিনা। সঙ্গে ছিলেন তাঁর নেদারল্যান্ডসের বাবা-মা এবং গোয়া থেকে দত্তক নেওয়া তাঁর ভাই।

দুই সপ্তাহ ধরে তাঁরা বিভিন্ন নথি খুঁজেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল মিনার জৈবিক বাবা-মা সম্পর্কে কিছু জানা। মিনা বলেন, ‘এটা জানা গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে আমি কোথা থেকে এসেছি। কিন্তু অনাথ আশ্রম কর্তৃপক্ষ কোনো তথ্য দেয়নি।’

এখন মিনা ও মিনাল বোনের মতো করে একে অপরের খোঁজ রাখছেন। মিনা বলেন, ‘কখনো কখনো আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলি, সময়ের হিসাবই থাকে না। হঠাৎ মনে পড়ে, আমাদের বাচ্চাদের স্কুল থেকে আনতে হবে কিংবা বাজারে যেতে হবে।’

দুই বোনই এখনো নিজেদের শেকড়ের সন্ধানে আছেন। মিনা বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে ভারতে যেতে চাই। মুম্বাইয়ের রাস্তায় একসঙ্গে হাঁটতে চাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘এমনও সময় গেছে, যখন আমরা দুজনই খুব একা অনুভব করেছি। যখন বাবাকে হারিয়েছি বা কোনো সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছিল, তখন মনে হয়েছে, কেউ থাকত যাকে মনের কথা বলা যায়। আমরা একে অপরের পাশে থাকতে পারিনি, এটাই আমার আফসোস। যদি আগেই জানতাম আমরা বোন, তাহলে একে অপরের আনন্দ ভাগ করে নিতে পারতাম, কঠিন সময়ে একে অপরকে সাহায্য করতে পারতাম।’

ঢাকা এক্সপ্রেস/এসএস

আরও পড়ুন