ঢাকা, রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৫ আশ্বিন ১৪৩৩, ০৭ রবিউস সানি ১৪৪৮

কান্নার পর মন হালকা লাগে কেন?

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৩:২৬, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কান্নার পর মন হালকা লাগে কেন?

ছবি: সংগৃহীত

কখনো কি এমন হয়েছে, কঠিন একটি দিন কাটানোর পর কিছুক্ষণ মন খুলে কেঁদেছেন? কান্নার পর হয়তো সমস্যাটির সমাধান হয়নি। তবু অনেকটা শান্তি অনুভব করেছেন। অনেকের ক্ষেত্রেই কান্নার পর এমন স্বস্তি আসে। এটি সমস্যার সমাধান না করলেও কখনো কখনো আবেগ সামলে নেওয়া সহজ করে দিতে পারে।

কান্না মানুষের স্বাভাবিক আবেগীয় প্রতিক্রিয়া। দুঃখ, বিহ্বলতা, হতাশা, রাগ, আঘাত কিংবা প্রচণ্ড আনন্দের মতো অনুভূতিতেও কান্না আসতে পারে। তবে প্রশ্ন হলো, কান্নার পর কখনো কখনো কেন ভালো লাগে?

কান্না মানসিক চাপ কমাতে পারে

আবেগ জমতে থাকলে সেটি চেপে রাখা অনেক সময় ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। অনুভূতিগুলো আটকে না রেখে কান্না সেগুলো প্রকাশের একটি স্বাভাবিক সুযোগ তৈরি করে।

এর অর্থ এই নয় যে চোখের পানি মানসিক চাপ বা নেতিবাচক আবেগ পুরোপুরি দূর করে দেয়। তবে দীর্ঘ সময় মানসিক চাপের মধ্যে থাকার পর নিজেকে কাঁদতে দিলে সেটি অনেক সময় মুক্তির মতো অনুভূত হতে পারে। বিশেষ করে যখন আর নিজের আবেগ লুকানো বা নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন থাকে না, তখন স্বস্তির অনুভূতিও বাড়তে পারে।

শরীর ধীরে ধীরে শান্ত হয়

তীব্র আবেগের মুহূর্তে কান্নার সঙ্গে শরীরে বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। বুকে চাপ অনুভূত হওয়া, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, পেশিতে টান কিংবা হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

আবেগের তীব্রতা কমে এলে শরীরও ধীরে ধীরে শান্ত অবস্থায় ফিরতে শুরু করতে পারে। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে। পেশি শিথিল হতে পারে। তীব্র অনুভূতিটিও আগের তুলনায় কম অপ্রতিরোধ্য মনে হতে পারে। তখন অনেকের মনে হতে পারে, যেন মনের ওপর থাকা একটি ভার কিছুটা নেমে গেছে।

নিজের আবেগ বুঝতে সাহায্য করতে পারে

কখনো কখনো আমরা কী অনুভব করছি, সেটি পুরোপুরি বুঝতে পারি না। নিজেকে সেই অনুভূতিগুলো উপলব্ধি করার সুযোগ দেওয়ার পর বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে।

মোটিভেশন অ্যান্ড ইমোশন জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, কান্না মানুষকে আবেগ থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়ার বদলে সেগুলো স্বীকার করার সুযোগ দিতে পারে। এতে কেউ বুঝতে পারেন, তিনি আসলে আঘাত পেয়েছেন, হতাশ হয়েছেন, ক্লান্ত হয়েছেন কিংবা কোনো পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত চাপে পড়ে গেছেন।

এই আবেগীয় সচেতনতা পরবর্তী সময়ে নিজের প্রয়োজন বুঝতেও সাহায্য করতে পারে। যেমন কোনো চাপপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে কান্নার পর কেউ বুঝতে পারেন, নিজেকে আরও চাপ দেওয়ার বদলে তাঁর বিশ্রাম প্রয়োজন। কারও সঙ্গে কথা বলা, সমর্থন নেওয়া কিংবা বাস্তবসম্মত কোনো সমাধান খোঁজার প্রয়োজনও তিনি উপলব্ধি করতে পারেন।

কান্না সাহায্যের প্রয়োজনের সংকেতও হতে পারে

অনেক সময় নিজের অনুভূতি বোঝানোর মতো শব্দ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়। সে ক্ষেত্রে কান্না আবেগ প্রকাশের একটি মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

রিসার্চগেটে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, কাঁদছেন এমন কেউ হয়তো ঠিক কী ঘটেছে তা ব্যাখ্যা করতে পারছেন না। তবে তাঁর চোখের পানি বুঝিয়ে দিতে পারে যে তিনি কষ্টের মধ্যে আছেন।

এ সময় কেউ সান্ত্বনা দিলে, আশ্বস্ত করলে কিংবা শুধু মন দিয়ে কথা শুনলে সামাজিক সমর্থনের কারণে স্বস্তির অনুভূতি আরও বাড়তে পারে। এ কারণেই একা কান্না করা আর বিশ্বস্ত কারও সামনে কান্নার অভিজ্ঞতা অনেক সময় এক রকম হয় না।

কান্নার পর সবসময় ভালো লাগে না কেন?

কান্না মানসিক অবস্থার সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধারের কোনো নিশ্চিত উপায় নয়। কান্নার পর কেউ শান্তি অনুভব করতে পারেন। আবার কেউ ক্লান্ত, বিব্রত, বিরক্ত কিংবা আরও বেশি আবেগপ্রবণ বোধ করতে পারেন।

কান্নার প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করে এর কারণ, পরিবেশ, নিরাপত্তাবোধ ও পরবর্তী সময়ে পাওয়া মানসিক সমর্থনের ওপর। মূল সমস্যাটি থেকে গেলে কান্নার পর পাওয়া সাময়িক স্বস্তি কমে যাওয়ার সঙ্গে দুঃখ বা মানসিক চাপ আবার ফিরে আসতে পারে।

তাই কান্নাকে মানসিক কষ্টের নিরাময় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এটি তীব্র আবেগের প্রতি শরীর ও মনের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার একটি উপায়।

কান্না চেপে রাখা কি অস্বাস্থ্যকর?

মাঝে মাঝে না কাঁদার সিদ্ধান্ত নেওয়া নিজে থেকে ক্ষতিকর নয়। এমন অনেক পরিস্থিতি থাকতে পারে, যেখানে সাময়িকভাবে আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন হয়। কাজের সময়, গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক কিংবা জরুরি পরিস্থিতি তার উদাহরণ।

তবে সব সময় প্রতিটি আবেগীয় প্রতিক্রিয়া দমন করার চেষ্টা করলে নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলো বোঝা কঠিন হয়ে যেতে পারে।

আবার নিজেকে জোর করে কাঁদানোরও প্রয়োজন নেই। মানুষ আবেগ প্রকাশ করে ভিন্ন ভিন্নভাবে। কেউ সহজেই কেঁদে ফেলেন। আবার কেউ গভীরভাবে বিচলিত হলেও খুব কমই চোখের পানি ফেলেন।

কখন ঘন ঘন কান্নাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন?

মাঝেমধ্যে কান্না করা মানুষের স্বাভাবিক আবেগীয় জীবনের অংশ। তবে ঘন ঘন বা অনিয়ন্ত্রিত কান্নার সঙ্গে যদি দীর্ঘস্থায়ী দুঃখ, হতাশা, কোনো কিছুতে আগ্রহ না থাকা, তীব্র উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা কিংবা দৈনন্দিন কাজ সামলাতে অসুবিধা দেখা দেয়, তখন বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। এতে মানসিক কষ্টের পেছনে থাকা কারণ শনাক্ত করতে সহায়তা মিলতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কান্নার জন্য নিজেকে দোষারোপ না করা। কঠিন অনুভূতির প্রতি অশ্রু একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। কখনো কখনো নিজেকে কাঁদতে দেওয়ার মাধ্যমে মনের জন্য একটি ছোট বিরতি তৈরি হয়। এতে নিজের অনুভূতিকে চেনা সহজ হতে পারে। পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রেও তা সহায়ক হতে পারে।

ঢাকা এক্সপ্রেস/এসএস

আরও পড়ুন