শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২:২৪, ২১ নভেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, সিলেট এবং ঢাকা অঞ্চল ভূমিকম্পের পুরোনো চিহ্ন বহন করে। ১৫৪৮, ১৬৪২, ১৬৬৩, ১৭৬৫, ১৮১২, ১৮৬৫ ও ১৮৬৯ সালের দিকে বিভিন্ন মাত্রার ভূমিকম্পের উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু সেগুলোর কোনোটি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই। ঠিক কত মাত্রার ছিল বা কত ক্ষতি হয়েছিল, তা ইতিহাসে পুরোপুরি লিপিবদ্ধ হয়নি। শুধু জানা যায়, এসব ঘটনা জনপদের মানুষের জীবনে আতঙ্ক তৈরি করেছিল এবং ভূগঠনেও ক্ষুদ্র–বৃহৎ পরিবর্তন ঘটিয়েছিল।
১৮১৮ ও ১৮২২ সালে সিলেট ও শ্রীমঙ্গলে দুটি বড় ভূমিকম্পের নথি পাওয়া যায়, যেগুলো ৭.৫ থেকে ৭.৬ মাত্রার ছিল বলে ধারণা করা হয়। যদিও ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা খুব বিস্তৃত নয়, তবুও ধারণা করা হয় এগুলো ছিল সে সময়কার অন্যতম প্রধান টেকটনিক বিপর্যয়। গত ১২০–১২৫ বছরে বাংলাদেশে অন্তত শতাধিক ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। যদিও সাত বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের সংখ্যা খুব কম, তবে ভূতত্ত্ববিদরা মনে করেন—আমাদের ভূত্বকের নিচে দীর্ঘদিন ধরে শক্তি জমা হচ্ছে, এবং এই শক্তি একসময় বড় আকারে মুক্তি পেলে ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প ঘটতে পারে।
এই অঞ্চলের স্মরণীয় ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ১৫৪৮ সালের কম্পন। আসামে হওয়া এই ভূমিকম্পটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে অঞ্চলটির টেকটনিক আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। কিন্তু কোন পরিবর্তনটি কী মাত্রায় ঘটেছিল, তা ইতিহাস বলে না। প্রায় এক শতাব্দী পর আপার আসামে হওয়া আরেকটি ভূমিকম্প আবারও সেই পরিবর্তনকে গভীর করে।
১৭৬২ সালের ভূমিকম্প ছিল এই অঞ্চলের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা। টেকনাফ থেকে মিয়ানমারের উপকূল পর্যন্ত প্রায় ৪০০ কিলোমিটারজুড়ে থাকা ফল্ট লাইনের ওপর এটি আঘাত হানে, শক্তি ছিল ৮.৫ মাত্রার বেশি। এই বিশাল কম্পনের অভিঘাতে সেন্টমার্টিন দ্বীপ তিন মিটার ওপরে উঠে আসে—যা এর আগে মূলত ছিল ডুবন্ত দ্বীপ। মিয়ানমারের একটি দ্বীপ ছয় মিটার বেড়ে যায়। সীতাকুন্ডে পাহাড় ভেদ করে গভীর মাটি থেকে কাদা-বালুর উদগীরণ হয়। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সুনামি ঢাকার বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত গিয়ে বাড়িঘর ধ্বংস করে দেয় এবং প্রায় পাঁচশ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আজও ভূতত্ত্ববিদরা এই ভূমিকম্পকে বঙ্গোপসাগরের টেকটনিক গঠনে সবচেয়ে প্রভাবশালী ঘটনা一 হিসেবে মনে করেন।
১৭৮৭ সালে শিলং প্ল্যাটুতে আরেকটি বড় ভূমিকম্প ঘটে, যা ব্রহ্মপুত্র নদীর গতিপথই বদলে দেয়। আগে নদী ময়মনসিংহ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হতো, পরে তা যমুনার দিকে সরতে থাকে—যা নদীবিজ্ঞানীদের কাছে এখনো বিস্ময়ের বিষয়।
১৮৮৫ সালে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় ঘটে ‘বেঙ্গল আর্থকোয়েক’, যার উৎপত্তি মধুপুর ফল্টে। ধারণা করা হয়, এর মাত্রা ছিল ৬.৫ থেকে ৭.০। ঢাকায়, ময়মনসিংহে, পাবনায়, বগুড়ায় বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বসে পড়ে, মানুষের প্রাণহানি হয়। ভারতের সিকিম, বিহার, মনিপুর এবং মিয়ানমারেও এই কম্পন অনুভূত হয়। সে সময়ের সরকারি রিপোর্ট খুব সীমিত হওয়ায় বিস্তারিত তথ্য নেই।
১৮৮৯ সালে মেঘালয়ের জৈন্তা পাহাড়ে আরেকটি বড় ভূমিকম্প হয়, যার মাত্রা ছিল ৭.৫। সিলেট এবং দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চল জুড়ে কাঁপন অনুভূত হলেও নথিভুক্ত বিবরণ কম।
১৮৯৭ সালের ভূমিকম্প দক্ষিণ এশিয়ার ভূমিকম্প–ইতিহাসে এক বিশাল দাগ রেখে গেছে। এটি শিলং প্ল্যাটুতে ঘটে, মাত্রা ছিল ৮.২। কম্পন দিল্লি থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত অনুভূত হয়। এই ভূমিকম্পে মেঘালয়, সিলেট, ময়মনসিংহ এবং ঢাকায় ১৬০০–এর বেশি মানুষ মারা যায়। ধ্বংসযজ্ঞ ছিল এতটাই ভয়াবহ যে ব্রিটিশরা ঢাকা ও আসামের বড় অংশে তাবুতে কয়েক মাস বসবাস করেন। স্থানীয় লোককথায় এমনকি পাওয়া যায়—কবি হাছন রাজার প্রিয় পোষা হাতিটি ভূমিকম্পে সৃষ্ট গভীর ফাটলে পড়ে মারা যায়। এই ঘটনার পর তিনি আত্মিকভাবে বদলে যান এবং পরে তার সৃষ্টিতে গভীর মরমী ঢং দেখা যায়।
১৯৫০ সালে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়—মাত্রা ছিল ৮.৫। উৎপত্তিস্থল ছিল মিশমি পাহাড়। ভারতে চার হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়, পাহাড়–ধস এবং তীব্র বন্যায় বিশাল এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যায় ভেসে আসা গাছপালা ও বিপুল পরিমাণ পলি বাংলাদেশ পর্যন্ত এসে জমে যায়। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনেও কম্পন অনুভূত হলেও ক্ষতি ছিল তুলনামূলক কম।
১৯৩৪ সালের বিহার ভূমিকম্পও এই অঞ্চলে প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে উত্তর–বঙ্গ এবং সিলেট অঞ্চলে তার কাঁপন অনুভূত হয়েছিল।
এতসব ইতিহাস স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশ ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা। দেশের নিচে থাকা ফল্ট লাইনগুলোতে শক্তি জমে আছে দীর্ঘদিন ধরে, আর সেই শক্তি ভবিষ্যতে যেকোনো সময় বড় আকারে মুক্তি পেতে পারে। তাই ভবন নির্মাণমান কঠোরভাবে অনুসরণ, প্রস্তুতি বৃদ্ধি, সচেতনতা এবং জরুরি ব্যবস্থাপনা—সবই এখন সময়ের দাবি। ভূমিকম্প রোধ করা সম্ভব না হলেও প্রস্তুতি থাকলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব, আর তা এখনই জরুরি।
ঢাকা এক্সপ্রেস/ এমআরএইচ