ঢাকা, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

২০ কার্তিক ১৪৩৩, ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

লাউয়াছড়ায় আট মাসে ২০ বার ট্রেন বিকল, আতঙ্কে যাত্রীরা

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৩:০০, ৪ নভেম্বর ২০২৬

লাউয়াছড়ায় আট মাসে ২০ বার ট্রেন বিকল, আতঙ্কে যাত্রীরা

ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস

মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাওয়া আখাউড়া-সিলেট রেলপথ এখন ট্রেনযাত্রীদের কাছে আতঙ্কের নাম। বনের ভেতরের মাত্র পাঁচ কিলোমিটারের আঁকাবাঁকা ও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি পথে ট্রেন বিকল ও লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা যেন নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সর্বশেষ গত ১ অক্টোবর রাতে আন্তনগর কালনী এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল হয়ে এক ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। পরদিন ২ অক্টোবর দুপুরে চট্টগ্রামগামী পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের হুক ছিঁড়ে নয়টি বগি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে তিন ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই অন্তত ২০ বার ইঞ্জিন বিকল হয়ে লাউয়াছড়ার নির্জন বনে আটকে পড়ে যাত্রীবাহী ট্রেন। এতে যাত্রীদের চরম ভোগান্তির পাশাপাশি দেখা দিচ্ছে শিডিউল বিপর্যয়।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ১৮৯৮ সালে আসাম-চট্টগ্রাম যোগাযোগের জন্য নির্মিত হয় এ রেলপথ। শতবর্ষেরও বেশি পুরোনো এই পথে বর্তমানে ঢাকা-সিলেট ও চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে প্রতিদিন ছয়টি আন্তনগর ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেনে প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন।

মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা গেছে, শ্রীমঙ্গল ও ভানুগাছ স্টেশনের মধ্যবর্তী লাউয়াছড়া অংশে রেললাইনের স্লিপারের অধিকাংশ নাট-বল্টু ও ক্লিপ নেই। কোথাও ঢিলে হয়ে যাওয়া ক্লিপে নামমাত্র ঝালাই করা হয়েছে, কোথাও তার দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা হয়েছে নাট। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

রেলসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, লাউয়াছড়ার ভাঙা ব্রিজ এলাকায় রেললাইনের ঢাল অনেক বেশি। এই পাহাড়ি উঁচু পথে ট্রেন টেনে তুলতে পর্যাপ্ত ক্ষমতার ইঞ্জিন প্রয়োজন। কিন্তু সিলেট রুটে ব্যবহার করা হচ্ছে ১৮-১৯ বছর পুরোনো মেয়াদোত্তীর্ণ ২৯০০ ও ২৬১০ সিরিজের ইঞ্জিন। ঢাকা থেকে যে ইঞ্জিনে ট্রেন সিলেটে যায়, বিকল্প না থাকায় সেই ইঞ্জিন দিয়েই ফিরতি ট্রেন চালাতে হয়। পাহাড়ি চড়াইয়ে উঠতে গিয়ে ইঞ্জিনের প্রেসার কমে যায়। ফলে মাঝপথে থেমে যায় ট্রেন।

শ্রীমঙ্গল ও ভানুগাছ স্টেশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি পাহাড়িকা এক্সপ্রেস পাঁচ ঘণ্টা, ১ মার্চ উপবন এক্সপ্রেস পাঁচ ঘণ্টা এবং ৭ ও ১৯ মার্চ কালনী এক্সপ্রেস যথাক্রমে দেড় ও দুই ঘণ্টা আটকে ছিল। ১ এপ্রিল কালনী এক্সপ্রেস পাঁচ ঘণ্টা আটকে থাকে। এ ছাড়া ২৯ মে একটি তেলবাহী ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়।

জানা গেছে, ২০১৯ সালে একনেক সভায় আখাউড়া-সিলেট মিটারগেজ রেলপথকে ডুয়েল গেজে রূপান্তরের জন্য ১৬ হাজার ১০৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

এ অবস্থায় জীর্ণ রেলপথ সংস্কারের দাবিতে কুলাউড়ায় কর্মসূচি পালন করছে ‘আট দফা দাবি বাস্তবায়ন আন্দোলন পরিষদ’।

পরিষদের মুখ্য সমন্বয়ক আজিজুল ইসলাম বলেন, সিলেট বিভাগের রেলপথ চরম অবহেলিত। এ অবস্থার পরিবর্তনে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বলেন, প্রায়ই মাগুরছড়া এলাকায় ট্রেন আটকে পড়ার খবর পান তারা। বন বিভাগ সাধ্যমতো সহায়তা করে।

ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার গৌড় প্রসাদ দাস পলাশ বলেন, ভাঙা ব্রিজ এলাকার চড়াইয়ে উঠতে গিয়ে প্রায়ই ইঞ্জিন বিকল হয়। গত আট মাসে অন্তত ২০ বার এমন ঘটনা ঘটেছে।

শ্রীমঙ্গল রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সাইফুল্লাহ বলেন, পাহাড়ি পথ হওয়ায় গতি কমিয়ে সতর্কতার সঙ্গে ট্রেন পরিচালনা করতে হয়। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও চলছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দীন বলেন, নতুন ইঞ্জিনের সংকট থাকায় মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়েই ট্রেন চালাতে হচ্ছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা এক্সপ্রেস এর ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করুন।

ঢাকা এক্সপ্রেস/এসএস

আরও পড়ুন