শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩:৪৮, ৪ নভেম্বর ২০২৬
ফাইল ছবি
জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সংশোধনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সম্পত্তি বিক্রি, উত্তরাধিকার দাবি ও পাসপোর্ট পরিবর্তনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জালিয়াতির চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। এমন অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, গ্রেপ্তার এবং কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতির মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
জালিয়াতি ঠেকাতে এনআইডি সংশোধনের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই করছে কমিশন। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র যাচাই করে সন্তুষ্ট হওয়ার পরই সংশোধনের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বাসসকে বলেন, ‘এই অভিযোগে আমাদের অনেক কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত হয়েছেন। অনেকের বিরুদ্ধে আমরা ফৌজদারি মামলা করেছি। তাদের গ্রেপ্তারের ব্যবস্থাও করেছি। সুতরাং আমরা ছাড় দিচ্ছি না।’
তিনি বলেন, অনেকে নাম পরিবর্তন করে সম্পত্তি বিক্রি, উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা এবং জালিয়াতির মাধ্যমে পাসপোর্ট পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন। এ কারণে প্রতিটি আবেদন যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি।
ইসির কর্মকর্তারা জানান, এনআইডি জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সম্প্রতি ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আ. ছত্তার এবং পঞ্চগড় সদর কার্যালয়ের অফিস সহকারী কামনা রানী সরকারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
বয়স ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যে অসংগতি
ইসি কর্মকর্তাদের মতে, এনআইডি সংশোধনের আবেদনে বিভিন্ন ধরনের অসংগতি পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পিতা ও ছেলের বয়সের ব্যবধান মাত্র তিন বছর, আবার মা ও মেয়ের বয়সের ব্যবধান দুই থেকে তিন বছর। কারও একাধিক জন্মনিবন্ধন বা শিক্ষাগত সনদও রয়েছে।
ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, অনেক আবেদনকারী আগের নিবন্ধনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক জন্মতারিখ সংশোধন করতে চান।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি ১৯৯৭ সালে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং ২০১৫ সালে ১৮ বছর বয়সে ভোটার হয়েছেন। পরে তিনি জন্মসাল ২০০২ করতে চাইছেন। এতে ভোটার হওয়ার সময় তার বয়স দাঁড়ায় ১৩ বছর। এমন আবেদন গ্রহণ করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, অনেকে বিদেশে যাওয়ার সমস্যা বা ব্যক্তিগত অসুবিধার কথা বলে মানবিক বিবেচনায় তথ্য সংশোধনের আবেদন করেন। কিন্তু যথাযথ যাচাই ছাড়া অনুমোদন দিলে ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশনকেই জটিলতার মুখে পড়তে হয়।
সিইসি বলেন, বিদেশি নাগরিক বা রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয়ে এনআইডি সংগ্রহের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের ঝুঁকি এড়াতে আবেদনগুলো তদন্ত ও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
যেসব নথি যাচাই করছে ইসি
কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ এনআইডি সংশোধনের আবেদন উপজেলা পর্যায়েই নিষ্পত্তি করা সম্ভব। তবে নাম, বাবা-মায়ের পরিচয় ও জন্মতারিখের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য একসঙ্গে পরিবর্তনের আবেদন জটিল হওয়ায় সেগুলো উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়।
এসব ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদসহ প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়। বাবার নাম পরিবর্তনের আবেদন এলে বাবার এনআইডি এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গেও মিলিয়ে দেখা হয়।
শুধু হলফনামার ভিত্তিতে এ ধরনের সংশোধন করা হয় না।
সিইসি বলেন, কেউ নিজের নাম ও বাবার নাম পরিবর্তন করতে চাইলে প্রয়োজনে তার ভাই-বোনদের এনআইডিও যাচাই করা হয়। এতে পরিবারের সদস্যদের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়।
সংশোধন নিয়ে ভোগান্তির অভিযোগ
এনআইডি সংশোধন করতে গিয়ে ভোগান্তির অভিযোগও করছেন আবেদনকারীরা।
সম্প্রতি যশোরের কেশপুরের হরিদাশ কর্মকার (ছদ্মনাম) স্ত্রীর এনআইডিতে নাম সংশোধনের জন্য নির্বাচন কমিশনে আসেন। তিনি জানান, ছয় মাস আগে তার স্ত্রীর নাম সংশোধনের আবেদন করেন। তখন জানানো হয়, স্ত্রীর নামে দুটি জন্মনিবন্ধন রয়েছে। একটি বাতিল করে আনলে সংশোধন করা হবে।
পরে একটি জন্মনিবন্ধন বাতিল করে আবার ইসিতে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা স্ত্রীর ভাই-বোনদের প্রত্যয়নপত্র ও বায়োমেট্রিক তথ্যসহ আরও কিছু নথি জমা দিতে বলেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে না পারায় এখনো সংশোধনের কাজ শেষ করতে পারেননি তিনি।
১৩ লাখ ৫৫ হাজার আবেদন বাতিল
ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এনআইডি সংশোধনের জন্য ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৪২টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২টি আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। বাতিল হয়েছে ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৭টি।
বাতিলের কারণ হিসেবে প্রয়োজনীয় তথ্য ও জন্মসনদের অভাবের কথা জানিয়েছেন সিইসি। অনেকের একাধিক জন্মসনদ, এসএসসি বা স্নাতকের সনদ থাকায় কোন নথির তথ্য গ্রহণযোগ্য, তা নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে আবেদন বাতিল হলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে পুনরায় আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
আখতার আহমেদ বলেন, বাতিলের সংখ্যা মানেই এতজন আবেদনকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, বিষয়টি এমন নয়। একজন আবেদনকারী চার-পাঁচবার আবেদন করতে পারেন। আবার একটি আবেদনে একাধিক তথ্য সংশোধনের অনুরোধ থাকলে কিছু তথ্য সংশোধন হলেও অন্যগুলো বাতিল হতে পারে।
তিনি জানান, উপজেলা থেকে মহাপরিচালক পর্যায় পর্যন্ত আবেদন বাতিল হলে সচিব পর্যায়েও আপিলের সুযোগ রয়েছে। কোনো কোনো আবেদন ছয়-সাতবার পর্যন্ত বাতিল হয়েছে। তাই বাতিল হওয়া আবেদনের সংখ্যা দিয়ে প্রকৃত আবেদনকারীর সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না।
প্রবাসীদের এনআইডি সেবায় বিশেষ উদ্যোগ
প্রবাসীদের এনআইডি সেবা সহজ ও দ্রুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসি। যেসব আবেদনকারীর কাগজপত্র সঠিক, তাদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে।
সিইসি বলেন, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দূতাবাসে প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি সেবা চালু করা হয়েছে।
তিনি জানান, অনেক প্রবাসী সঠিক পাসপোর্ট ব্যবহার না করে বিদেশে গেছেন। কেউ কেউ দালালের মাধ্যমেও বিদেশে গেছেন। এসব তথ্য যাচাই করতে সময় প্রয়োজন হয়। সৌদি আরবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে কাজ করার বিষয়ে প্রতিবেদনও পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
সিইসি বলেন, প্রবাসীদের তথ্য সঠিক থাকলে দ্রুত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে। দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি প্রবাসীদের ভিআইপি মর্যাদায় সেবা দেওয়ার আশ্বাস দেন।
আখতার আহমেদ বলেন, অনেকে এনআইডি করার পর জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়ে পাসপোর্ট তৈরি করেন। এতে দুই নথির তথ্যে অমিল দেখা দেয়। জন্মনিবন্ধন তৈরির সময় এনআইডির তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখলে এ সমস্যা এড়ানো সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কাজের ক্ষেত্রে বয়সের শর্ত থাকায় অনেকে বয়স ও অন্যান্য তথ্য পরিবর্তন করেন। পরে জটিলতা তৈরি হলে বাবা-মায়ের নাম পরিবর্তনের আবেদনও করেন।
কোন তথ্য সংশোধন সহজ
ইসির লক্ষ্য, নাগরিকেরা যেন ভোটার নিবন্ধনের সময় সঠিক তথ্য দেন এবং পরবর্তী সময়ে সংশোধনের প্রয়োজন না হয়। তবে স্থানান্তরের কারণে ঠিকানা পরিবর্তন, বিয়ে বা বিবাহবিচ্ছেদের কারণে বৈবাহিক অবস্থার পরিবর্তন কিংবা ধর্ম পরিবর্তনের মতো বিষয় নির্ধারিত নিয়মে সংশোধনের সুযোগ রয়েছে।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন্স) মো. সাইফুল ইসলাম বাসসকে বলেন, নাম, বাবা-মায়ের পরিচয় ও জন্মতারিখের মতো মৌলিক তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে যথাযথ তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।
ঢাকা এক্সপ্রেস/এসআই