শিরোনাম
প্রকাশ: ১৫:৪৯, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৫:৪৯, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দিতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাঁচটি অগ্রাধিকার খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। খাতগুলো হলো—অটোমোটিভ উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণা, রেল ও লজিস্টিকস এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্প।
টোকিওর জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) হলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম ডায়ালগ’-এ প্রধান বক্তার বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে জাপানি কোম্পানিগুলোকে এসব খাতে ভবিষ্যৎ সহযোগিতা ও ব্যবসার সুযোগ অনুসন্ধানের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরে তারেক রহমান জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে বাংলাদেশে জাপানের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের নিচে। গত অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ১৩৬ কোটি ডলার এবং দেশটি থেকে আমদানি হয়েছে ২১৬ কোটি ডলারের পণ্য।
তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ককে শুধু উন্নয়ন সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে এগিয়ে নিতে হবে।
পাঁচ খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা
অটোমোটিভ খাতকে প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদন কারখানা স্থাপনে টয়োটার পরিকল্পনাকে স্বাগত জানান। ২০২৯ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানটিকে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
জ্বালানি খাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। এ খাতে বাংলাদেশের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জাপানি প্রতিষ্ঠান জেরার সঙ্গে সহযোগিতার কথাও তুলে ধরেন।
প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণায় সহযোগিতার বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক এবং উদ্ভাবনভিত্তিক আইটি পার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি স্যাটেলাইট প্রকৌশল, মহাকাশবিজ্ঞান ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ।
রেল ও লজিস্টিকস খাতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালসহ প্রধান শহরগুলোকে যুক্ত করে আধুনিক ও দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এ জন্য মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা বিশ্লেষণ এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী।
কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের শস্য, ফল ও শাকসবজি উৎপাদিত হয়। জাপানি কোম্পানিগুলো নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোনে বিনিয়োগ করতে পারে। সুমিতোমো করপোরেশন জাপানি মানদণ্ড অনুসরণ করে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি উন্নয়ন করছে।
বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্ব
জাপানি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের বিষয়গুলো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, উন্নত অবকাঠামো এবং সহজ কাস্টমস ও করব্যবস্থা বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সরকার এসব বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের চাহিদা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করছে।
তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের নিশ্চয়তা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা প্রয়োজন। সরকার এই বিষয়গুলো উপলব্ধি করে বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে।
বাংলাদেশের বাজার ও জনশক্তির সম্ভাবনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ১৮ কোটির বেশি মানুষের বাজার, গড়ে ২৭ বছর বয়সী তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় সুযোগ। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ভোক্তা অর্থনীতির একটিতে পরিণত হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির সুফল
বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশগুলোর মধ্যে জাপান অন্যতম। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
তিনি আরও বলেন, এ বছর দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য প্রথম এ ধরনের চুক্তি। এর আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। অন্যদিকে স্টিল, অটোমোটিভ যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক পণ্যসহ জাপানি পণ্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবে।
দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, প্রতি বছর অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য জাপানে যান। বাংলাদেশি তরুণদের জাপানি ভাষা শেখানোর ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে, যাতে তাঁরা কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি ভাষাগত দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। এর মাধ্যমে দুই দেশের শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে দক্ষ পেশাজীবীরা ভূমিকা রাখতে পারবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ যখন তার ভিত্তি নির্মাণ করছিল, তখন জাপান পাশে দাঁড়িয়েছিল। এখন বাংলাদেশের শিল্প গড়ে তোলা, নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং যৌথভাবে সমৃদ্ধি অর্জনে জাপানের অংশীদারত্ব চায় সরকার।
জেট্রো, জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (জেবিসিসিইসি) এবং জাপানে বাংলাদেশ দূতাবাসের যৌথ সহযোগিতায় এ ফোরামের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে জেট্রোর সভাপতি সুসুমু কাতাওকা সূচনা বক্তব্য দেন। জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের পার্লামেন্টারি ভাইস মিনিস্টার শিনজি ওয়াকায়ামা অতিথি বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন।
এ ছাড়া অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গঠনের বিষয়ে এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বিনিয়োগ সহজীকরণে সরকারের সংস্কার কার্যক্রম তুলে ধরেন। মিৎসুই অ্যান্ড কোম্পানির ঢাকা শাখার জেনারেল ম্যানেজার কেনইচিরো কাওয়ামোতো, ওয়াইকেকে করপোরেশনের গ্লোবাল সেলসের ভাইস প্রেসিডেন্ট রেইসুকে আরাতানি এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।