শিরোনাম
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১:০০, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস
হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই অধিকাংশ ইটভাটা পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রায় অর্ধশত ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় উপজেলার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। আবাদি জমি ও আবাসিক এলাকার আশপাশে এসব ইটভাটা গড়ে ওঠায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
নিয়মের তোয়াক্কা না করে এসব ভাটায় ইট পোড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, আবাসিক এলাকা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, বাণিজ্যিক এলাকা, কৃষিজমি এবং পরিবেশের ক্ষতি হয়—এমন স্থানে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। তবে আইন অমান্য করে বাহুবল উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বছরের পর বছর পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই ইটভাটা পরিচালনা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ভাটায় বনের কাঠ পোড়ানোর অভিযোগও উঠেছে।
জানা গেছে, উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে অর্ধশতাধিক ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এর অনেকগুলোরই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে আবাদি জমি ও আবাসিক এলাকার পাশে এসব ইটভাটা পরিচালিত হচ্ছে। ভাটার মালিকেরা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
ইট তৈরির প্রধান উপকরণ মাটি সংগ্রহ করতে গিয়ে আবাদি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। ভাটার আশপাশে কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি কেটে স্তূপ করে রাখার দৃশ্যও দেখা গেছে। এ ছাড়া ইটভাটায় মাটি পরিবহনে নম্বরবিহীন ট্রাক ব্যবহারের কারণে গ্রামীণ সড়কগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবগত থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তারা কঠোর অভিযান চালানোর দাবি জানিয়েছেন।
পরিবেশবিদদের ভাষ্য, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিতভাবে ইটভাটা পরিচালিত হচ্ছে। অনেক ভাটায় বনের কাঠ পোড়ানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব অবৈধ কার্যক্রম পরিবেশের জন্য হুমকি তৈরি করছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ইটভাটার চারপাশে রয়েছে বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমি। এসব স্থাপনার কাছেই চলছে ইট পোড়ানোর কার্যক্রম। তবে ইটভাটার প্রকৃত সংখ্যা, কতটির পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে এবং ছাড়পত্রবিহীন ভাটার বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে জানতে চাওয়া হলেও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে ইটভাটাগুলোর বৈধতা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে হবিগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. ইউসুফ আলীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে তার মুঠোফোনে তিনটি খুদে বার্তা পাঠিয়ে বাহুবল উপজেলায় ছাড়পত্রবিহীন ইটভাটার সংখ্যা, কতটি ইটভাটার পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে এবং ছাড়পত্র ছাড়া ইটভাটা পরিচালনার দায়ে মালিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না বা ভবিষ্যতে নেওয়া হবে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো উত্তর দেননি।
একই বিষয়ে বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উজ্জ্বল রায়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তার মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে তথ্য ও বক্তব্য চাওয়া হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
এদিকে হবিগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক হরিপদ চন্দ্র দাশের কাছে মুঠোফোনে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কার্যালয়ে গিয়ে বক্তব্য নেওয়ার কথা বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরে তার মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে একই তিনটি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানতে চাওয়া হয়। জবাবে তিনি ‘তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করুন’ বলে জানান।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও বক্তব্য না পাওয়ায় বাহুবল উপজেলায় পরিবেশগত ছাড়পত্রবিহীন ইটভাটার প্রকৃত সংখ্যা এবং সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সচেতন মহলের কয়েকজনের অভিযোগ, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া ইটভাটা পরিচালিত হলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি থাকা সত্ত্বেও কোনো ইটভাটা প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছাড়া পরিচালিত হয়ে থাকলে সেগুলোর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
এ ছাড়া ইটভাটার মালিকদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ছাড়পত্র ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন কেউ কেউ। তবে এ অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া ইটভাটা পরিচালনার অভিযোগ যাচাই, ইটভাটার তালিকা প্রকাশ এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকেরা। তাদের মতে, পরিবেশ সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ঢাকা এক্সপ্রেস/এসএস