শিরোনাম
নরসিংদী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১:২১, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার বান্দারদিয়া গ্রামের লুৎফর রহমান সরকার। অভাব-অনটনের সেই দিন পেরিয়ে এখন তিনি সফল নার্সারি ব্যবসায়ী। নিজের প্রচেষ্টায় গড়ে তুলেছেন নার্সারি। এখন আর তাকে রিকশা চালাতে হয় না। বিভিন্ন জাতের গাছ ও ফল-ফুলের চারা বিক্রি করে হয়েছেন কোটিপতি। তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন ১৭ জন শ্রমিক।
জানা গেছে, ১৯৮৯ সালে বাড়ির আঙিনায় মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পুঁজি নিয়ে নার্সারির ব্যবসা শুরু করেন লুৎফর রহমান। বর্তমানে তার নার্সারিতে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার বিভিন্ন জাতের গাছের মজুত রয়েছে। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে তিনি আয় করেন ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। তার নার্সারির নাম ‘মেসার্স পল্লি নার্সারি সেন্টার’।
লুৎফর সরকার জানান, ১৯৮৭ সালে শিবপুর পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় টিফিনের বিরতিতে অন্য বন্ধুদের মতো আড্ডা না দিয়ে পাশের শিবপুর বন বিভাগে ঘুরে বেড়াতেন। তখন থেকেই তার মনে নার্সারি গড়ে তোলার স্বপ্ন জাগে। এতে একদিকে দেশের উপকার হবে, অন্যদিকে নিজের অভাবও দূর হবে বলে ভাবতেন তিনি।
সংসারের অভাব-অনটন দূর করতে কখনো রিকশা চালাতেন, কখনো বেতের দরজা বানিয়ে বিক্রি করতেন লুৎফর। এভাবে সংসার চালানোর পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যান। ১৯৯৩ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে যেতে না পারায় বাবার অগোচরে বাড়ির আঙিনায় ছোট পরিসরে চারা লাগানো শুরু করেন। ধীরে ধীরে চারার চাহিদা বাড়তে থাকলে নার্সারির পরিসরও বাড়াতে থাকেন তিনি। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আজ সফল নার্সারি ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন লুৎফর রহমান।
শিবপুর ফায়ার সার্ভিসের পাশে ১০ বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠেছে তার নার্সারি। এর মধ্যে পাঁচ বিঘা জমি কিনেছেন এবং বাকি পাঁচ বিঘা ভাড়া নিয়েছেন।
নার্সারি ব্যবসায় সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে এ পর্যন্ত শিবপুর উপজেলায় ১৩ বার, জেলায় সাতবার এবং জাতীয় পর্যায়ে ২০১০ ও ২০২৬ সালে পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। এর মধ্যে ১৯৯৮ সালে শিবপুর উপজেলায় প্রথম ও জেলায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। ১৯৯৯ সালে উপজেলা ও জেলা—উভয় পর্যায়েই প্রথম হন। ২০০৯ সালে একটি মেলায় প্রথম স্থান অর্জন করেন।
এবার ২০২৬ সালের ৯ জুলাই থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জাতীয় বৃক্ষমেলায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন লুৎফর রহমান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার স্টল পরিদর্শন করেন এবং তার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
বর্তমানে লুৎফর রহমানের নার্সারিতে ফুল, ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছসহ হাজার হাজার চারা রয়েছে। সারা বছর সেখানে বিভিন্ন জাতের গাছ পাওয়া যায়। বিদেশি ফলের চারার মধ্যে রয়েছে রামবুটান, অ্যাভোকাডো, পার্সিমন, ডুরিয়ান, আপেল, থাই লংগান ও বারোমাসি ভিয়েতনামি পিংক কাঁঠাল। দেশি ফলের মধ্যে রয়েছে লটকন, নারিকেল, সফেদা, বেল, পেয়ারা, বড়ই, কাঁঠাল, জলপাই ও আম।
এ ছাড়া ঔষধি গাছের মধ্যে হরিতকী, আমলকী, দেশি নিম ও অর্জুনের চারা রয়েছে। ফুলের মধ্যে বিভিন্ন জাতের রঙ্গন, গোলাপ, জবা, হাসনাহেনা, গন্ধরাজ, কামিনী ও বেলি পাওয়া যায়। সবজির মধ্যে রয়েছে মরিচ, টমেটো, বেগুন, পেঁপে, শসা ও জালি। কাঠের জন্য মেহগনি, সেগুন ও গর্জনসহ বিভিন্ন জাতের চারাও রয়েছে।
লুৎফর রহমান জানান, তার নার্সারিতে প্রতিনিয়ত ১৭ জন শ্রমিক কাজ করছেন। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় করেন তিনি। এ আয় দিয়ে তার মা-বাবাসহ সাত সদস্যের সংসার ভালোভাবেই চলছে বলে জানান তিনি।
ঢাকা এক্সপ্রেস/এসএস