ঢাকা, রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

১০ কার্তিক ১৪৩৩, ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

স্বীকৃতি ছাড়াই চলে গেলেন বীরাঙ্গনা জয়গুন নাহার

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৯:৩২, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

স্বীকৃতি ছাড়াই চলে গেলেন বীরাঙ্গনা জয়গুন নাহার

ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস

মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়েও জীবদ্দশায় বীরাঙ্গনার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের জয়গুন নাহার খানম। দীর্ঘদিন বার্ধক্য ও নানা রোগে ভোগার পর গত শুক্রবার ভোর ৬টায় নিজ বাড়িতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন ৬৮ বছর বয়সী এই নারী।

জয়গুন নাহার কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর ইউনিয়নের ভাদাইর দেউল গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় শমশেরনগর-সংলগ্ন চাতলাপুর চা বাগান এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে তিনি ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হন। স্বাধীনতার পরও পরিবার ও সমাজের নানা কটূক্তি সহ্য করে জীবন কাটাতে হয়েছে তাঁকে।

শমশেরনগর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, শুক্রবার বিকেল ৫টায় জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে জয়গুন নাহারকে দাফন করা হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, বীরাঙ্গনার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেতে আবেদন করেছিলেন জয়গুন নাহার। ২০২২ সালের ৭ সেপ্টেম্বর আবেদনটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানো হয়। তবে এরপর আর আবেদনটির অগ্রগতি হয়নি বলে পরিবারের দাবি।

জীবনের শেষ দিকে আর্থিক সংকট ও অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর দুটি কিডনিই বিকল ছিল। অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাঁর স্বামী সুবেদার লালখাঁন আগেই মারা গেছেন।

বীরাঙ্গনাদের নিয়ে গবেষণাকারী মৌলভীবাজার টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের ইনস্ট্রাক্টর দীপঙ্কর মোহন্ত বলেন, জয়গুন নাহার খানমের জীবনের গল্প অনেকটাই আড়ালে থেকে গেছে। নানা বঞ্চনা নিয়েও তিনি লড়াই করে গেছেন। একবার অনেক কষ্টে তাঁর কাছে গিয়ে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে পিটিআইয়ের একটি অনুষ্ঠানে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

দীপঙ্কর মোহন্ত বলেন, আশা করেছিলেন, রাষ্ট্র জয়গুন নাহারকে স্বীকৃতি দেবে এবং তিনি জীবনের শেষ সময়টুকু মর্যাদা নিয়ে কাটানোর সুযোগ পাবেন। কিন্তু জীবদ্দশায় সেই স্বীকৃতি আর মেলেনি।

স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা নির্মল কুমার দাস বলেন, জয়গুন নাহার খানম মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও তাঁর মতো একজন বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি না পাওয়া দুঃখজনক।

জয়গুন নাহারের মৃত্যুতে আবারও সামনে এসেছে মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতনের শিকার নারীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, সামাজিক মর্যাদা ও পুনর্বাসনের প্রশ্ন। তাঁর আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পাঠানো হলেও জীবদ্দশায় স্বীকৃতি না পাওয়ার ঘটনা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ত্যাগের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জয়গুন নাহারের জীবনাবসান তাই শুধু একজন নারীর মৃত্যু নয়; বরং তাঁর স্বীকৃতি ও মর্যাদার অপেক্ষা অপূর্ণ থেকে যাওয়ার বেদনাদায়ক স্মারক।

ঢাকা এক্সপ্রেস/এসআই

আরও পড়ুন