শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:৫৭, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
বর্তমান বিশ্বে স্বীকৃত স্বাধীন দেশের সংখ্যা ১৯৫টি। এর মধ্যে আপনি কয়টি দেশের নাম বলতে পারবেন? ১০টি, ২০টি, ৩০টি, নাকি ৫০টি? অনেকে হয়তো ১৯৫টি দেশের নাম মুখস্থ করে রেকর্ড গড়তে চাইবেন। তবে সেটি ভিন্ন বিষয়। সাধারণ মানুষ ইন্টারনেট ও মুঠোফোনের কল্যাণে এখন ঘরে বসেই অনেক দেশের নাম জানতে পারেন। তবে এসব দেশ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সবার জানা নেই।
বিশ্বে এমন কিছু দেশ রয়েছে, যেগুলো একবিংশ শতাব্দীতেও নিজেদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধরে রেখেছে। পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্য, নিয়ম ও রীতিনীতির অনেক কিছুই সেখানে এখনো প্রচলিত। এমনই একটি দেশ ভ্যাটিকান সিটি। দেশটি নিয়ে এমন একটি দাবি প্রচলিত আছে, যেখানে গত ১০০ বছরে কোনো শিশুর জন্ম হয়নি। এ ছাড়া দেশটির নিজস্ব সাধারণ হাসপাতাল নেই। তবে এসব তথ্যের পেছনের বাস্তবতা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক।
ইতালির রাজধানী রোমের ব্যস্ত রাস্তা, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও জনবহুল এলাকার মাঝখানে অবস্থিত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ভ্যাটিকান সিটি। পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত দেশটিকে ঘিরে রয়েছে নানা বিস্ময়। এখানে রয়েছেন ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ। রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা, অসাধারণ শিল্পকর্ম ও ইতিহাসসমৃদ্ধ জাদুঘর। অথচ এত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব সাধারণ হাসপাতাল নেই।
শুনতে অবাক লাগলেও ভ্যাটিকান সিটির জীবনযাপনের ধরন অনেক দেশের চেয়ে আলাদা। সেখানকার কেউ অসুস্থ হলে কী করেন? কোনো শিশুর জন্মের প্রয়োজন হলে কোথায় যান? আর কেনই বা এত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রে হাসপাতাল গড়ে ওঠেনি? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে পরিচিত পৃথিবীর বাইরের এক ভিন্ন বাস্তবতার সন্ধান পাওয়া যায়।
ভ্যাটিকান সিটির আয়তন মাত্র শূন্য দশমিক ৪৪ বর্গকিলোমিটার বা ৪৪ হেক্টর। চারদিকে ইতালির রাজধানী রোম। এর মাঝেই প্রাচীরঘেরা এই স্বাধীন রাষ্ট্রের অবস্থান। ১৯২৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইতালির সঙ্গে ল্যাটেরান চুক্তির মাধ্যমে ভ্যাটিকান সিটির সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
দেশটির পরিচয় অবশ্য শুধু আয়তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ক্যাথলিক চার্চের কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে এর ধর্মীয় গুরুত্ব অপরিসীম। সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে প্রতিদিন ভিড় করেন পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরা। ভ্যাটিকান জাদুঘর ও সিস্টিন চ্যাপেলের শিল্পকর্ম দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। তবে আন্তর্জাতিক পরিচিতির আড়ালে দেশটির দৈনন্দিন জীবনযাত্রা বেশ ব্যতিক্রমী।
ধরা যাক, ভ্যাটিকান সিটিতে কর্মরত কেউ হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাকে চিকিৎসার জন্য দূরের কোনো দেশে যেতে হবে না। ভ্যাটিকান সিটি রোমের ভেতরে অবস্থিত হওয়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীকে রোমের হাসপাতালগুলোতে নেওয়া যায়।
রাষ্ট্রটির নিজস্ব হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ব্যবস্থা নেই। তবে সেখানে স্বাস্থ্যসেবা একেবারেই অনুপস্থিত, এমন নয়। ভ্যাটিকানের সরকারি তথ্যভান্ডারে স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বিভাগ এবং ওষুধের দোকানের উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ, ছোট রাষ্ট্রটির চিকিৎসাব্যবস্থা তার ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কয়েকশ মানুষের জন্য আলাদা পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল গড়ে তোলার পরিবর্তে জটিল চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রতিবেশী শহরের হাসপাতাল ব্যবহার করা হয়। এর সুবিধা হলো, উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্র খুব কাছেই রয়েছে।
সত্যিই কি ১০০ বছরে জন্ম নেয়নি কোনো শিশু?
‘১০০ বছরেও জন্মায়নি কোনো শিশু’—এমন শিরোনাম শুনলে মনে হতে পারে, ভ্যাটিকান সিটিতে শিশুর জন্ম নিষিদ্ধ। বাস্তবে বিষয়টি তেমন নয়। রাষ্ট্রটির নিজস্ব প্রসূতি হাসপাতাল বা মাতৃসদন নেই। এ কারণে সাধারণত সন্তান জন্মদানের জন্য মায়েদের রোমের হাসপাতালগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়।
আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, ভ্যাটিকান সিটির নাগরিকত্ব সাধারণত জন্মস্থানের ভিত্তিতে দেওয়া হয় না। নির্দিষ্ট পদে দায়িত্ব পালন, সেই দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত বসবাস এবং প্রযোজ্য নিয়মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব নির্ধারিত হয়। তবে ১৯২৯ সালে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে টানা ১০০ বছর সেখানে কোনো শিশুর জন্ম হয়নি—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তাই এই তথ্যকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
ভ্যাটিকান সিটির জনসংখ্যাও বিস্ময় জাগানোর মতো ছোট। দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানে নাগরিক ছিলেন ৬৭৩ জন। তবে রাষ্ট্রটির ভেতরে বসবাসকারী নাগরিক ও অনাগরিক মিলিয়ে বাসিন্দার সংখ্যা ছিল ৮৮২। অর্থাৎ, নাগরিকের সংখ্যা ও মোট বাসিন্দার সংখ্যা এক নয়।
এখানে রয়েছেন পোপ, যাজক, বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি এবং পোপের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সুইস গার্ডের সদস্যরা। দেশটির আয়তন ও জনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় সরকারি দপ্তরসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রোমের ভেতরে ভ্যাটিকানের অধিকারভুক্ত অন্য ভবনেও কাজ করে।
ভ্যাটিকান সিটির গল্প শুধু হাসপাতাল না থাকার বিস্ময় নয়। এটি দেখায়, একটি রাষ্ট্রের সব পরিষেবা তার নিজস্ব সীমানার মধ্যে থাকতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা ও প্রশাসনিক প্রয়োজন বিবেচনা করে ভিন্ন ব্যবস্থায়ও নাগরিকদের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় কেন্দ্র হয়েও ভ্যাটিকান সিটি দৈনন্দিন চিকিৎসার জন্য পাশের রোমের ওপর নির্ভর করে। এই বৈপরীত্যই দেশটিকে আরও কৌতূহলোদ্দীপক করে তুলেছে। আয়তনে ক্ষুদ্র এই রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু তার প্রাচীর, গির্জা কিংবা পোপকে ঘিরে নয়; সীমিত পরিসরে কীভাবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নিজের প্রয়োজন মেটায়, সেই অনন্য ব্যবস্থার মধ্যেও এর বিশেষত্ব লুকিয়ে রয়েছে।
ঢাকা এক্সপ্রেস/এসএস