ঢাকা, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

১ কার্তিক ১৪৩৩, ০৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

মিলনের পর সঙ্গীকে খায় স্ত্রী অক্টোপাস!

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৬:৫৮, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

মিলনের পর সঙ্গীকে খায় স্ত্রী অক্টোপাস!

ছবি : সংগৃহীত

সমুদ্রের গভীরে বসবাসকারী রহস্যময় প্রাণীদের মধ্যে অক্টোপাস অন্যতম। তিনটি হৃদপিণ্ড, নীল রক্ত, মুহূর্তে শরীরের রং ও গঠন বদলে ফেলার ক্ষমতা—সব মিলিয়ে প্রাণীটি যেন প্রকৃতির এক বিস্ময়। তবে এর প্রজনন ও জীবনচক্রের কিছু আচরণ আরও চমকপ্রদ। নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে মিলনের পর স্ত্রী অক্টোপাস পুরুষ সঙ্গীকে আক্রমণ করে খেয়ে ফেলতে পারে। প্রাণিজগতে এ আচরণকে বলা হয় ‘যৌন নরখাদকতা’ বা সেক্সুয়াল ক্যানিবালিজম।

মিলনের পর সঙ্গীকে খেয়ে ফেলা

সব প্রজাতির অক্টোপাসের মধ্যে এমন আচরণ দেখা যায় না। তবে কিছু প্রজাতির স্ত্রী অক্টোপাস মিলনের সময় বা পরে পুরুষ সঙ্গীকে আক্রমণ করে খেয়ে ফেলতে পারে। এ ঝুঁকির কারণে পুরুষ অক্টোপাস অনেক সময় স্ত্রী সঙ্গীর কাছাকাছি যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করে।

প্রজননের সময় এমন আচরণ দেখা গেলেও এর পেছনে প্রজাতিভেদে ভিন্ন কারণ থাকতে পারে। খাদ্যের চাহিদা, আকারের পার্থক্য এবং সঙ্গীর আচরণ এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনটি হৃদপিণ্ড ও নীল রক্ত

অক্টোপাসের শারীরিক গঠনের অন্যতম বিস্ময় হলো এর তিনটি হৃদপিণ্ড। এর মধ্যে দুটি ফুলকার মধ্য দিয়ে রক্ত সঞ্চালন করে। অন্যটি শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্ত সরবরাহ করে।

এদের রক্তের রং লাল নয়, নীলচে। কারণ, মানুষের রক্তে অক্সিজেন পরিবহনে হিমোগ্লোবিন কাজ করলেও অক্টোপাসের রক্তে রয়েছে তামাযুক্ত প্রোটিন ‘হিমোসায়ানিন’। অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হলে এ প্রোটিন নীলচে রং ধারণ করে। ঠান্ডা ও অক্সিজেনের স্বল্পতা রয়েছে—এমন পানির পরিবেশে অক্সিজেন পরিবহনে এটি সহায়ক।

প্রজনন ও মাতৃত্বের কঠিন অধ্যায়

পুরুষ অক্টোপাসের একটি বিশেষায়িত বাহু থাকে, যার নাম ‘হেক্টোকোটাইলাস’। এ বাহুর সাহায্যে স্ত্রী অক্টোপাসের কাছে শুক্রাণু পৌঁছে দেওয়া হয়।

প্রজননের পর অনেক প্রজাতির পুরুষ অক্টোপাসের জীবনচক্রের শেষ পর্যায় শুরু হয়। অন্যদিকে, স্ত্রী অক্টোপাস ডিম পাড়ার পর সেগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে দীর্ঘ সময় ব্যয় করে। ডিমের ওপর পানি প্রবাহিত করে অক্সিজেন সরবরাহ করা এবং শিকারি প্রাণীর হাত থেকে সেগুলো রক্ষা করা তার গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

এ সময় অনেক স্ত্রী অক্টোপাস খাবার গ্রহণ বন্ধ করে দেয়। ফলে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পর তাদের জীবনও শেষ হয়ে যেতে পারে। গভীর সমুদ্রে একটি স্ত্রী অক্টোপাসকে প্রায় সাড়ে চার বছর ডিম পাহারা দিতে দেখা গেছে, যা প্রাণিজগতে দীর্ঘতম মাতৃত্বকালীন পরিচর্যার অন্যতম উদাহরণ।

অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও ছদ্মবেশ

অক্টোপাস শুধু শারীরিক বৈশিষ্ট্যেই নয়, বুদ্ধিমত্তার দিক থেকেও ব্যতিক্রমী। সমস্যা সমাধান, বিভিন্ন বস্তু ব্যবহার এবং পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এদের বিশেষভাবে পরিচিত করেছে।

অক্টোপাসের স্নায়ুতন্ত্রের বড় অংশ বাহুগুলোতে বিস্তৃত। ফলে বাহুগুলো স্পর্শ ও পরিবেশের সংকেতের ভিত্তিতে অনেক কাজ স্থানীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাহুগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে মস্তিষ্কের বাইরে কাজ করে।

ত্বকের বিশেষ রঞ্জক কোষ ‘ক্রোমাটোফোর’ এবং অন্যান্য গঠনগত বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে অক্টোপাস দ্রুত শরীরের রং ও বাহ্যিক চেহারা বদলাতে পারে। এতে শিকারি প্রাণীর চোখ এড়িয়ে চলা এবং শিকার ধরার সুবিধা হয়। বিপদের মুখে অনেক অক্টোপাস কালি ছুড়ে পালিয়ে যায়।

ডাইনোসরেরও আগে থেকে পৃথিবীতে

জীবাশ্মের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোপাসের বিবর্তনীয় ইতিহাস বহু প্রাচীন। সেফালোপড বা শুঁড়যুক্ত সামুদ্রিক প্রাণীদের পূর্বপুরুষদের অস্তিত্ব ডাইনোসরের আবির্ভাবেরও বহু আগে ছিল। তবে আধুনিক অক্টোপাসের বিবর্তনের ইতিহাস আরও জটিল এবং এর বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে গবেষণা চলছে।

তিনটি হৃদপিণ্ড, নীল রক্ত, অসাধারণ ছদ্মবেশ, বুদ্ধিমত্তা ও ব্যতিক্রমী প্রজনন আচরণ—সব মিলিয়ে অক্টোপাস সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের এক বিস্ময়কর প্রতিনিধি। এর জীবনচক্র মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতিতে টিকে থাকার কৌশল কত বিচিত্র হতে পারে।

ঢাকা এক্সপ্রেস/এসআই

আরও পড়ুন