ঢাকা, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

২৬ আশ্বিন ১৪৩৩, ২৮ রবিউস সানি ১৪৪৮

ট্রাম্পের গায়ে নারায়ণগঞ্জের স্যুট, আলোচনায় বাংলাদেশের পোশাকশিল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৩:০৭, ১১ অক্টোবর ২০২৬

ট্রাম্পের গায়ে নারায়ণগঞ্জের স্যুট, আলোচনায় বাংলাদেশের পোশাকশিল্প

ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে নেব্রাস্কার একটি সমাবেশে যে গাঢ় নীল স্যুটটি পরেছিলেন, সেটি তৈরি হয়েছে নারায়ণগঞ্জের আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড)। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানি কিছুটা কমলেও ভবিষ্যতে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য দেশটির বাজারের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারকেরা। সংশ্লিষ্ট কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমনটাই জানিয়েছেন।

মার্কিন ব্র্যান্ড ‘জোস. এ. ব্যাংক’-এর স্যুটটি তৈরি করেছে ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরিফ জহির এ তথ্য জানিয়েছেন। গত ৫ অক্টোবর নেব্রাস্কার গ্র্যান্ড আইল্যান্ডে আয়োজিত ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ সমাবেশে স্যুটটি পরেছিলেন ট্রাম্প।

স্যুটটির ব্র্যান্ডের নাম আলোচনায় আসার পর এটি কোথায় তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গত বৃহস্পতিবার সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, স্যুটটি বাংলাদেশ অথবা চীনে তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক শরিফ জহির এ ঘটনাকে প্রতিষ্ঠানের দক্ষ শ্রমিকদের পাশাপাশি বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য গৌরবের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, একজন ধনী মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সাশ্রয়ী মূল্যে তৈরি বাংলাদেশি স্যুট পরতে দেখা দেশের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সাশ্রয়ী উৎপাদন সক্ষমতার প্রতিফলন।

ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য স্যুট, ব্লেজার, জ্যাকেট ও ট্রাউজার তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটির কারখানা পাঁচ লাখ বর্গফুটের বেশি জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। কোম্পানির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে স্বয়ংক্রিয় কাপড় কাটার ব্যবস্থা, বিশেষায়িত সেলাই ও প্রেসিং মেশিন রয়েছে। এ ছাড়া উৎপাদন ও গুদামজাতকরণ এলাকায় পণ্য পরিবহনে ব্যবহার করা হয় কনভেয়রভিত্তিক ব্যবস্থা।

ইউরোপের পর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নজর

শরিফ জহির জানান, বর্তমানে ইউরোপ বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সবচেয়ে বড় বাজার হলেও সেখানে সম্প্রসারণের সুযোগ প্রায় সীমিত হয়ে এসেছে।

তিনি বলেন, ‘ইউরোপীয় বাজার প্রায় পূর্ণ হয়ে আসায় বাংলাদেশি পোশাকের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হবে যুক্তরাষ্ট্র।’

তিনি আরও জানান, অনন্ত গ্রুপের বিভিন্ন ইউনিটে ডেনিম, সোয়েটার, নারী ও পুরুষদের পোশাক এবং অ্যাক্টিভওয়্যার তৈরি করা হয়।

শরিফ জহিরের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে কার্যকর শুল্ক কাঠামোও বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনামের তুলনায় বাংলাদেশের শুল্ক হার মাত্র এক শতাংশের মতো বেশি। ফলে কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করতে পারলে এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব।

পলিয়েস্টার ও নাইলনের পোশাক উৎপাদনে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এ ধরনের পোশাক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড় তৈরির কারখানা স্থাপনে বড় বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে আসারও আহ্বান জানান তিনি।

শরিফ জহির বলেন, বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পৌঁছাতে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগে। এ ছাড়া শুল্ক বিভাগের ছাড়পত্র পেতেও অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়।

তিনি বলেন, ‘ভিয়েতনাম ও মিসরের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীরা যুক্তরাষ্ট্রে অনেক দ্রুত পণ্য পাঠাতে পারে। তাই পণ্য সরবরাহের সময় কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

অর্ডারের সময়সীমা সম্পর্কে শরিফ জহির জানান, শরৎ মৌসুমের অর্ডারের কাজ শেষ হয়েছে। এখন তাঁদের প্রতিষ্ঠান বসন্ত ও পরবর্তী সময়ে গ্রীষ্মকালীন পোশাকের অর্ডার নিচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধির বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে আসবে বলে আশা করছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির চিত্র

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল অফিসের (ওটিইএক্সএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে দেশটির পোশাক আমদানি কমেছে। তবে অন্য কয়েকটি প্রধান সরবরাহকারীর তুলনায় বাংলাদেশ এই মন্দা ভালোভাবে সামাল দিয়েছে। বিশেষ করে আগস্ট মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র মোট ৪৯ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ কম। বর্গমিটার সমতুল্য হিসাবে আমদানির পরিমাণ কমেছে ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ। তবে প্রতি ইউনিট পোশাকের গড় মূল্য বেড়েছে ১ দশমিক ৭১ শতাংশ।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমে ৫ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে শুধু আগস্ট মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বাংলাদেশের তুলনামূলক অনুকূল শুল্ক পরিস্থিতি দেশটির প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করছে।

তিনি বলেন, ‘চীনের মতো প্রতিযোগীদের সঙ্গে শুল্কের এই পার্থক্য ক্রেতাদের পণ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।’

মহিউদ্দিন রুবেল আরও বলেন, ‘আমাদের প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশের শুল্ক কাঠামো ভালো। স্বাভাবিকভাবেই ক্রেতারা সেই সুবিধা নিতে চাইবেন।’

ঢাকা এক্সপ্রেস/এসএস

আরও পড়ুন