শিরোনাম
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮:২৬, ৯ অক্টোবর ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন কার্ড পাওয়ার পথ আরও কঠিন করে তুলেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন কর্মীদের চাকরি সুরক্ষার যুক্তিতে স্থায়ী শ্রম সনদ কর্মসূচিতে বিশ্বের কয়েকটি শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে দেশটির সরকার। এতে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে ভারতের শীর্ষ তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) মার্কিন শ্রমসচিব কিথ সান্ডারলিং এ সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন। স্থগিতাদেশের আওতায় পড়া ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে কগনিজেন্ট, ইনফোসিস, টাটা, উইপ্রো ও এইচসিএল। এ ছাড়া তালিকায় রয়েছে ক্যাপজেমিনি, মাইক্রোসফট ও অ্যাডোবির মতো পশ্চিমা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও।
ঘোষণার সময় শ্রমসচিবের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন অ্যান্টি-ফ্রড টাস্ক ফোর্সের প্রধান এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
কিথ সান্ডারলিং বলেন, বিশ্বের বড় তথ্যপ্রযুক্তি আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান—কগনিজেন্ট, ইনফোসিস, টাটা, উইপ্রো, এইচসিএল ও ক্যাপজেমিনির স্থায়ী শ্রম সনদ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ স্থগিত করছেন তিনি।
তিনি আরও জানান, এখন থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নতুন কোনো আবেদন গ্রহণ করবে না মার্কিন সরকার। একই সঙ্গে চলমান আবেদনগুলোর প্রক্রিয়াকরণও বন্ধ থাকবে।
সান্ডারলিংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে এসব প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩০ লাখ বিদেশি কর্মীর জন্য আবেদন করেছে। এ পর্যন্ত তারা দুই লাখ ৩০ হাজারের বেশি এইচ-১বি ভিসার অনুমোদন এবং এক লাখের বেশি স্থায়ী শ্রম সনদ পেয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান মার্কিন কর্মীদের লাখ লাখ চাকরি কেড়ে নিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
স্থায়ী শ্রম সনদ কর্মসূচির আওতায় নিয়োগকর্তারা বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী চাকরি ও বসবাসের জন্য স্পন্সর করতে পারেন।
মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, এই কোম্পানিই কর্মসূচিটির সবচেয়ে বেশি অপব্যবহার করেছে। তাঁর দাবি, মাইক্রোসফট পর্যাপ্ত যোগ্য মার্কিন কর্মী পাচ্ছে না বলে দেখানোর চেষ্টা করেছিল। অথচ এই অজুহাতে প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালেই ছয় হাজার মার্কিন কর্মীকে চাকরিচ্যুত করেছিল।
ভ্যান্সের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে মাইক্রোসফট ছয় হাজারের বেশি এইচ-১বি ভিসার অনুমোদন পায় এবং প্রায় তিন হাজার ৬৮২টি পিইআরএম আবেদন জমা দেয়। এসব আবেদনের মধ্যে প্রায় এক হাজারটি ছিল চাকরিচ্যুত মার্কিন কর্মীদের একই পদের বিপরীতে।
প্রতি বছর অনুমোদিত এইচ-১বি ভিসার বড় একটি অংশ পান ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবীরা। মার্কিন নাগরিকদের চাকরি সুরক্ষার কথা বলে ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসনের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে তুলনামূলক কম খরচে দক্ষ কর্মী নিয়োগ করা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া কঠিন করে তোলা হচ্ছে।
এর আগে গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন এইচ-১বি অ-অভিবাসী ভিসার জন্য এক লাখ ডলার ফি আরোপসংক্রান্ত নির্বাহী আদেশের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার জেডি ভ্যান্স এইচ-১বি ভিসায় নিয়োগ করা বিদেশি কর্মীদের ‘বিদেশি চুক্তিবদ্ধ চাকর’ হিসেবে অভিহিত করেন। এ কর্মসূচি ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘ভিসা মিল’ বলেও আক্রমণ করেন তিনি।
ভ্যান্স আরও দাবি করেন, জে-১ ভিসা কর্মসূচির আওতায় গবেষক ও পণ্ডিতদের স্পন্সর করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও অস্বাভাবিক কিছু ঘটছে। তাঁর অভিযোগ, এসব বিশ্ববিদ্যালয় ভিসার অতিরিক্ত ব্যবহার করে মার্কিন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ও গবেষকদের মজুরি কমিয়ে দিচ্ছে।
ভ্যান্সের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড মার্কিন কর্মী ও দেশটির জীবনধারার প্রতি মৌলিক অপমান। মেধাবী ও দক্ষ ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে আসার সুযোগ দিতে তৈরি ভিসা কর্মসূচিগুলোকে মার্কিন কর্মীদের মজুরি কমানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিশেষ করে মাইক্রোসফটসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে না বলে অভিযোগ করেন ভ্যান্স। তাঁর ভাষ্য, নিয়ম অনুযায়ী বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন দেখিয়ে শ্রম বিভাগে আবেদন করার আগে প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে চাকরির বিজ্ঞাপন দিতে হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো ছোট শহরের পত্রিকায় চাকরির বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে। এরপর দাবি করে, পদটির জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়া হলেও কেউ আবেদন করেনি। এভাবে আবেদন না পাওয়ার বিষয়টিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মার্কিন কর্মীদের কার্যত বিদেশি চুক্তিবদ্ধ কর্মীদের দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
**নাসকমের প্রতিক্রিয়া**
ভারতের প্রযুক্তি খাতের সংগঠন নাসকম জানিয়েছে, ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এইচ-১বি ভিসার ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমিয়ে এনেছে।
এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, এ সিদ্ধান্ত একটি নির্দিষ্ট অভিবাসন পথকে প্রভাবিত করলেও অভিবাসন এবং দক্ষ কর্মীদের চলাচল দুটি আলাদা বিষয়। এগুলোকে একইভাবে বিবেচনা করা উচিত নয় বলে দীর্ঘদিন ধরে মত দিয়ে আসছে নাসকম।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্পমেয়াদি দক্ষ কর্মীর ঘাটতি পূরণে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচি। ভবিষ্যতেও এ ভূমিকা অব্যাহত থাকবে।
নাসকমের ভাষ্য, গত কয়েক বছরে ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এইচ-১বি ভিসার ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় কর্মী নিয়োগ বাড়িয়েছে এবং শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ কর্মীবাহিনী গড়ে তুলেছে।
সংগঠনটি আরও জানায়, ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ফরচুন ৫০০ তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানির সঙ্গে কাজ করে। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবন ও প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়েও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে তারা।
ঢাকা এক্সপ্রেস/এসএস