শিরোনাম
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২:০৭, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস
ময়মনসিংহ এখন যেন এক স্থবির শহর। প্রাচীন ঐতিহ্য ও বিভাগীয় সদর হিসেবে মর্যাদা বহন করা এই নগরীতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রধান সড়ক, অলিগলি কিংবা ব্যস্ত মোড়, সবখানেই তিন চাকার যানবাহনের আধিপত্য।
অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের বিপুল উপস্থিতি, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ মিলিয়ে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে নিবন্ধিত ইজিবাইক, অটোরিকশা ও মিশুক মিলিয়ে অনুমোদিত যানবাহনের সংখ্যা ১৬ হাজারেরও কম। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। জেলা ট্রাফিক পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা অবৈধ ও অনিবন্ধিত অটোরিকশাসহ প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার তিন চাকার যানবাহন নগরীর সড়কে চলাচল করছে।
১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী এই শহরের অধিকাংশ প্রধান সড়ক এখনো বেশ অপ্রশস্ত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, টাউন হল থেকে গাঙ্গিনারপাড় হয়ে রেলস্টেশনমুখী প্রধান দুই লেনের সড়কের প্রতিটি লেনের প্রশস্ততা মাত্র ১৭ ফুট। শহরের মোট আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ সড়ক থাকা প্রয়োজন হলেও ময়মনসিংহে সড়ক রয়েছে মাত্র ৫ শতাংশের মতো। সীমিত এই অবকাঠামোর মধ্যে ৪০ হাজারের বেশি অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচলে স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
অটোরিকশাচালকদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও ট্রাফিকবিষয়ক জ্ঞানের অভাবের পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্কদের গাড়ি চালানোর কারণে নিয়মিত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি ১ সেপ্টেম্বর নগরের রেলীর মোড়ে বেপরোয়া অটোরিকশার ধাক্কায় প্রাণ হারান বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহজাহান। চালকদের উল্টো পথে চলাচল, যেখানে-সেখানে হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো এবং যাত্রী পাওয়ার প্রতিযোগিতার কারণে দুর্ঘটনা যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
শুধু সড়ক ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নয়, অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, শহরজুড়ে বৈধ ও অবৈধভাবে চলাচলকারী বিপুলসংখ্যক অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে প্রতি মাসে আনুমানিক ১৯ লাখ ২২ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। এর একটি বড় অংশই অবৈধ গ্যারেজ ও অননুমোদিত সংযোগের মাধ্যমে চার্জ করা হয়। ফলে বিশেষ করে রাতে বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তীব্র লোডশেডিং এবং কম ভোল্টেজের সমস্যায় পড়ছেন সাধারণ গ্রাহকেরা।
নগরীর গাঙ্গিনারপাড়, চরপাড়া (মেডিকেল কলেজ এলাকা), নতুন বাজার, পাটগুদাম সেতু মোড় ও টাউন হল এলাকায় প্রায়ই যানজট লেগে থাকে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান সড়ক চরপাড়ায় রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সও ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকে। পাশাপাশি শহরের ভেতরে থাকা ১০টি রেলক্রসিংয়ে ট্রেন চলাচলের সময় ১৫ থেকে ২০ মিনিটের যানজট পুরো নগরীকে স্থবির করে দেয়।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রোকনুজ্জামান রোকন বলেন, “অবৈধ অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ ও নগরীর যানজট নিরসনে সিটি করপোরেশন সর্বাত্মকভাবে কাজ করছে। সিটি করপোরেশনের আওতায় লাইসেন্সধারী যানবাহনের সংখ্যা ১৬ হাজারেরও কম হলেও বাইরে থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার অবৈধ অটোরিকশা প্রবেশের কারণে শহর স্থবির হয়ে পড়ছে। সমস্যা সমাধানে আমরা ডিজিটাল অ্যাপ ও কিউআর কোডযুক্ত নম্বর প্লেট চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। পাশাপাশি ‘রেস্ট্রিক্টেড জোন’ নির্ধারণ এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, “যানজট সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের জন্য অটোরিকশা ও ইজিবাইককে একটি নিয়মতান্ত্রিক ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি শহরের ভেতরে থাকা বাস টার্মিনালগুলো শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়া এবং মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহনের অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে কাজ চলছে।”
ময়মনসিংহ জেলা ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (প্রশাসন) মো. গোলাম মাওলা জানান, “আদর্শ শহরের তুলনায় আমাদের সড়কের পরিমাণ খুবই কম। সীমিত এই সড়কে প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার অটোরিকশা চলাচল করায় যানজট নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুনির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ, অবৈধ অটোরিকশার প্রবেশ বন্ধ এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার যৌথ উদ্যোগ নিশ্চিত করা গেলে দ্রুত শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থায় স্বস্তি ফেরানো সম্ভব হবে।”
ঢাকা এক্সপ্রেস/এসএস