শিরোনাম
নোয়াখালী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০:০৫, ৩ নভেম্বর ২০২৬
ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রামপুর ইউনিয়নে সুন্দলপুর সাউথ-১ অনুসন্ধান কূপের দুটি পৃথক জোনে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)।
সংস্থাটির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, কূপ দুটির জোনে গ্যাসের মজুদ প্রায় ৯৭ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ)। ভোক্তা পর্যায়ের মূল্য বিবেচনায় এই গ্যাসের আনুমানিক দাম ৫ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা।
সোমবার (২ নভেম্বর) কূপটিতে অগ্নি প্রজ্বালনের মাধ্যমে গ্যাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। তবে গ্যাসের প্রকৃত প্রবাহ, উৎপাদনক্ষমতা এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য পরিমাণ জানতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। এ জন্য আগামী ১৫ দিন কূপটিতে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা চালানো হবে।
যেভাবে পাওয়া গেল গ্যাসের সন্ধান
বাপেক্সের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দলপুর সাউথ-১ অনুসন্ধান কূপটির খননকাজ শুরু হয় চলতি বছরের ৮ জুলাই। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব বিজয়-১০ রিগ ব্যবহার করে খনন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
প্রায় ৩ হাজার ২৮৯ মিটার গভীরতা পর্যন্ত খননের পর কূপটির দুটি পৃথক জোনে গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়। পরে অগ্নি প্রজ্বালনের মাধ্যমে গ্যাস থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বাপেক্স পরিচালিত ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে কূপটি খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার ও বাপেক্সের নিজস্ব অর্থায়নে সম্পন্ন হয়েছে অনুসন্ধান কার্যক্রম।
প্রাথমিক হিসাবে কূপটির দুটি জোনে মোট ৯৭ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ঘনফুট বা প্রায় ৯ হাজার ৭৬৯ কোটি ঘনফুট গ্যাসের মজুদ রয়েছে। বাপেক্সের হিসাব অনুযায়ী, ভোক্তা পর্যায়ের বর্তমান মূল্য বিবেচনায় এই গ্যাসের আনুমানিক দাম ৫ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা।
দৈনিক কত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে?
নতুন এই কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক কতটুকু গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন প্রাথমিক হিসাব প্রকাশিত হয়েছে।
বিডিনিউজ২৪ ও ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে দৈনিক ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, আজকের পত্রিকার প্রতিবেদনে প্রায় ১০ মিলিয়ন এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
তবে এসব হিসাব এখনো পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হয়নি। কূপটির প্রকৃত উৎপাদনক্ষমতা জানতে ড্রিল স্টেম টেস্ট বা ডিএসটি পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ডিএসটি পরীক্ষা?
ড্রিল স্টেম টেস্ট বা ডিএসটি কূপের ভেতরে থাকা গ্যাসের প্রবাহ, চাপ ও উৎপাদনক্ষমতা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এর মাধ্যমে কূপ থেকে কী পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব, গ্যাসের চাপ কেমন এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু, সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়।
ঢাকা এক্সপ্রেস এর ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করুন।
সুন্দলপুর সাউথ-১ কূপের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, কূপটিতে তেল কিংবা অন্য কোনো পদার্থের উপস্থিতি রয়েছে কি না, তা জানতে আগামী ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হবে।
পরীক্ষা শেষে কূপটির পূর্ণাঙ্গ সম্ভাবনা এবং গ্যাস উত্তোলনের বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।
২০ বছর উত্তোলনের পরিকল্পনা
বাপেক্সের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সুন্দলপুর সাউথ-১ কূপ থেকে আগামী ২০ বছর পর্যন্ত গ্যাস উত্তোলনের লক্ষ্য রয়েছে। তবে পরিকল্পিত সময় ধরে উৎপাদন চালিয়ে যেতে হলে কূপটির উৎপাদনক্ষমতা, গ্যাসের চাপ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারণ করা হবে।
দেশের জ্বালানি খাতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সার উৎপাদন ও আবাসিক খাতে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। অন্যদিকে, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জ্বালানি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন অনুসন্ধান কূপে গ্যাসের সন্ধান পাওয়া দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। সুন্দলপুর সাউথ-১ কূপ থেকে পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্যাস উত্তোলন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হলে তা দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস সরবরাহে ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমাতেও সহায়ক হতে পারে।
তবে গ্যাসের মজুদ থাকলেই পুরোটা উত্তোলন করা সম্ভব হয় না। উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ, উৎপাদন ব্যয়, গ্যাসের গুণগত মান এবং সরবরাহ অবকাঠামো—সবকিছু বিবেচনা করেই এর প্রকৃত অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নির্ধারণ করতে হবে।
সব মিলিয়ে, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে সুন্দলপুর সাউথ-১ অনুসন্ধান কূপে গ্যাসের সন্ধান দেশের জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। এখন সংশ্লিষ্টদের নজর আগামী ১৫ দিনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফলের দিকে। এই পরীক্ষার ফলেই জানা যাবে, নতুন কূপটি থেকে বাস্তবে কতটুকু গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হবে এবং দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে এটি কতটা অবদান রাখতে পারবে।
ঢাকা এক্সপ্রেস/এসএস