শিরোনাম
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ: ২০:০৩, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফাইল ছবি
সকালে অফিস, দিনের শুরুতেই অ্যাসাইনমেন্ট, এরপর ছুটতে হয় ঘটনাস্থলে। কখনো সংবাদ সম্মেলন, কখনো সাক্ষাৎকার, আবার কখনো রাত পর্যন্ত নিউজরুমে ব্যস্ততা। গণমাধ্যমে কাজ করা মানুষের দিন অনেক সময় ঘড়ির কাঁটার নিয়মে চলে না।
এই ব্যস্ততার মধ্যেও একজন মুসলিম গণমাধ্যমকর্মী ধর্মীয় দায়িত্বগুলো কীভাবে পালন করবেন—এটি অনেকের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কাজের চাপ থাকলেও পরিকল্পনা ও সচেতনতার মাধ্যমে পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি ধর্মীয় আমল চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
নামাজকে দিনের রুটিনে রাখুন
একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত নামাজ। গণমাধ্যমের কাজ যেহেতু অনেক সময় অনিয়মিত, তাই নামাজের সময়গুলো আগে থেকেই মাথায় রাখা প্রয়োজন।
অ্যাসাইনমেন্টে যাওয়ার আগে কাছাকাছি মসজিদ বা নামাজের জায়গা সম্পর্কে জেনে রাখা যেতে পারে। নিউজরুমে থাকলে বিরতির সময় নির্ধারণ করে নামাজ আদায় করা সম্ভব।
জরুরি সংবাদ বা বিশেষ পরিস্থিতিতে কাজের চাপ থাকতেই পারে। তবে নিয়মিত নামাজকে রুটিনের অংশ বানিয়ে নিলে ব্যস্ততার মধ্যেও তা পালন করা সহজ হয়।
অ্যাসাইনমেন্টের আগে পরিকল্পনা
রিপোর্টিংয়ের কাজে কোথায় যেতে হবে, কতক্ষণ থাকতে হবে—এসব অনেক সময় আগেই জানা যায়। তাই দিনের নামাজের সময়গুলো বিবেচনায় রেখে অ্যাসাইনমেন্টের পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
দূরের কোনো এলাকায় যেতে হলে আগে থেকেই নামাজের জায়গা খুঁজে রাখা, প্রয়োজনীয় সময় হাতে রাখা এবং সম্ভব হলে ওজুর ব্যবস্থা করে নেওয়া কাজে সহায়ক হতে পারে।
সাংবাদিকতার সততা ও ধর্মীয় আমল
ধর্ম পালন শুধু নামাজ, রোজা বা অন্যান্য আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন সাংবাদিকের পেশাগত সততাও তার নৈতিক দায়িত্বের অংশ।
তথ্য যাচাই না করে সংবাদ প্রকাশ না করা, গুজব এড়িয়ে চলা, ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য বিকৃত না করা এবং কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি অন্যায় পক্ষপাত না করা—এসব একজন গণমাধ্যমকর্মীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
একজন মুসলিম সাংবাদিকের জন্য সত্য ও ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধতা তাই পেশাগত নীতির পাশাপাশি নৈতিক মূল্যবোধেরও বিষয়।
রোজার সময় কাজের প্রস্তুতি
রমজানে গণমাধ্যমকর্মীদের কাজ আরও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। ইফতারের সময় অনেক সাংবাদিককে ঘটনাস্থলেই থাকতে হয়। আবার তারাবির সময়েও নিউজরুমে কাজ চলতে পারে।
এ সময় কাজের সূচি যতটা সম্ভব আগে থেকে পরিকল্পনা করা, ইফতারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী সঙ্গে রাখা এবং সুযোগ অনুযায়ী নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
রোজার মূল উদ্দেশ্য আত্মসংযম ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জন। তাই কর্মব্যস্ততার মধ্যেও রোজার আচার-আচরণ ও নৈতিক শিক্ষাগুলো ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান
গণমাধ্যম একটি বহুমত ও বহুধর্মের মানুষের কর্মক্ষেত্র। এখানে বিভিন্ন ধর্ম ও মতাদর্শের মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়।
ইসলামের নৈতিক শিক্ষা অনুযায়ী অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাস ও মর্যাদার প্রতি সম্মান দেখানো উচিত। সংবাদ সংগ্রহ, সাক্ষাৎকার কিংবা প্রতিবেদন তৈরির সময় কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে অযথা অবমাননা বা বিদ্রূপ না করে দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহার করা একজন সাংবাদিকের পেশাগত নৈতিকতারও অংশ।
কাজের মধ্যেও জিকির ও দোয়া
সব সময় দীর্ঘ সময় ধরে ইবাদত করা সম্ভব না হলেও ছোট ছোট আমল চালিয়ে যাওয়া যায়। যাতায়াতের সময় জিকির করা, সুযোগমতো দরুদ পড়া কিংবা আল্লাহর কাছে দোয়া করা যেতে পারে।
তবে কোনো আমল যেন পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। বরং ইবাদত ও কাজ—দুটোকেই দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পরিচালনা করাই উত্তম।
হারাম উপার্জন থেকে সতর্ক থাকা
গণমাধ্যমে কাজ করার ক্ষেত্রেও উপার্জনের বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। ঘুষ, অবৈধ সুবিধা, ব্যক্তিগত স্বার্থে সংবাদকে প্রভাবিত করা কিংবা পেশাগত ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে দূরে থাকা উচিত।
কারণ একজন মানুষের জীবিকা শুধু তার নিজের ওপর নয়, তার পরিবারের ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই হালাল ও নৈতিক উপার্জনের চেষ্টা ধর্মীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পরিবারের জন্য সময় রাখুন
গণমাধ্যমের পেশায় রাতজাগা ও অনিয়মিত কাজ অনেকের জীবনযাপনের অংশ। এর ফলে পরিবারকে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্বের মধ্যে পরিবারের প্রতিও দায়িত্ব রয়েছে। তাই কাজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো, তাদের খোঁজ নেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা দরকার।
পেশা ও ধর্ম—দুটোর মধ্যে ভারসাম্য
ধর্ম পালন মানে দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। আবার পেশাগত সাফল্যের জন্য ধর্মীয় দায়িত্বকে পুরোপুরি উপেক্ষা করাও একজন মুসলিমের জন্য আদর্শ নয়।
গণমাধ্যমের কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও যদি একজন সাংবাদিক সময় ব্যবস্থাপনা করেন, নামাজের প্রতি যত্নবান হন, সততা বজায় রাখেন, হারাম থেকে দূরে থাকেন এবং মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করেন—তাহলে পেশাগত জীবন ও ধর্মীয় জীবন পাশাপাশি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
শেষ পর্যন্ত একজন গণমাধ্যমকর্মীর পরিচয় শুধু তার পদবি বা প্রতিষ্ঠানের নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার সততা, দায়িত্ববোধ, ন্যায়পরায়ণতা ও মানুষের প্রতি আচরণও তার পরিচয়ের অংশ।
তাই নিউজরুমের ব্যস্ততা যতই থাকুক, ধর্মীয় দায়িত্বকে জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করা যায়। প্রয়োজন শুধু একটু পরিকল্পনা, আত্মসংযম এবং নিজের মূল্যবোধের প্রতি দৃঢ় থাকা।
ঢাকা এক্সপ্রেস/এসআই