শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৯:০৯, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফাইল ছবি
সময় মহান আল্লাহ তাআলার অন্যতম বড় নিয়ামত। মানুষের জীবন মূলত সময়েরই সমষ্টি। এই সময় সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হতে পারে। বিপরীতে সময়ের অপচয় মানুষকে ক্ষতির দিকে নিয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে বেশির ভাগ মানুষ প্রতারিত (ক্ষতিগ্রস্ত)—সুস্বাস্থ্য ও অবসর সময়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২)
তাই সময় ও সুযোগ হারিয়ে যাওয়ার আগে তা যথাযথভাবে কাজে লাগানোর তাগিদ রয়েছে ইসলামে। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটির আগে মূল্য দাও—বার্ধক্যের আগে যৌবন, অসুস্থতার আগে সুস্বাস্থ্য, দারিদ্র্যের আগে সম্পদ, ব্যস্ততার আগে অবসর এবং মৃত্যুর আগে জীবন।’ (মুসতাদরাক হাকিম, হাদিস: ৭৮৪৬)
বরকত বলতে কী বোঝায়
‘বরকত’ বলতে কল্যাণ, প্রাচুর্য ও স্থায়িত্ব বোঝায়। কোনো কাজে বরকত থাকার অর্থ হলো, তাতে কল্যাণ ও উপকার বৃদ্ধি পাওয়া এবং তা স্থায়ী হওয়া।
জীবনকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে সময়ের বরকত গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের পরিমাণ একই থাকলেও সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে অল্প সময়েও অনেক উপকারী কাজ করা সম্ভব।
শেষ যুগে সময় দ্রুত চলে যাওয়ার কথা
হাদিসে কিয়ামতের আগে সময় দ্রুত অতিক্রান্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের আগে সময় দ্রুত চলে যাবে, জ্ঞান কমে যাবে, ভূমিকম্প বৃদ্ধি পাবে, ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে এবং হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০৩৬)
অন্য এক হাদিসে এসেছে, এমন সময় আসবে যখন এক বছর এক মাসের মতো, এক মাস এক সপ্তাহের মতো, এক সপ্তাহ এক দিনের মতো এবং এক দিন এক ঘণ্টার মতো মনে হবে। (তিরমিজি, হাদিস: ২৩৩২)
আলেমরা এসব হাদিসের ব্যাখ্যায় সময়ের বরকত কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। সময়ের ঘাটতি নয়, বরং সময়ের সঠিক ব্যবহার না করতে পারাও মানুষের কাছে সময় দ্রুত চলে যাওয়ার একটি কারণ হতে পারে।
সময়ের বরকত লাভের ৯ উপায়
১. সময়ের মূল্য উপলব্ধি করা
সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এই সময় দিয়েই মানুষ নিজের দুনিয়া ও আখিরাতের জীবন গড়ে তোলে। তাই প্রতিটি মুহূর্তের গুরুত্ব উপলব্ধি করা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি তার করা ভালো ও মন্দ কাজ সামনে উপস্থিত পাবে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩০)
২. ভোরে দিনের কাজ শুরু করা
দিনের শুরুতে কাজ করার প্রতি ইসলামে গুরুত্ব রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করেছেন, ‘হে আল্লাহ! আমার উম্মতের জন্য তাদের সকালবেলার কাজে বরকত দান করুন।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১২১২)
তাই ভোরের সময় ইবাদত, পড়াশোনা ও গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য কাজে লাগানো যেতে পারে।
৩. সময়ের হিসাব দিতে হবে—এ কথা মনে রাখা
কিয়ামতের দিন মানুষের জীবন কীভাবে ব্যয় করেছে, সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন বান্দার দুই পা নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে চারটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে—তার জীবন কোথায় ব্যয় করেছে, তার জ্ঞান কী কাজে লাগিয়েছে, তার সম্পদ কোথা থেকে অর্জন করেছে ও কোথায় ব্যয় করেছে এবং তার শরীর কী কাজে ব্যবহার করেছে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৭)
এই জবাবদিহির কথা মনে রাখলে সময় অপচয় থেকে নিজেকে দূরে রাখা সহজ হয়।
৪. কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা
আল্লাহ তাআলা কোরআনকে বরকতময় কিতাব হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাজিল করেছি।’ (সুরা সাদ, আয়াত: ২৯)
তাই প্রতিদিনের রুটিনে কোরআন তিলাওয়াত ও এর শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার জন্য সময় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
৫. সময় নষ্টের কারণগুলো এড়িয়ে চলা
অপ্রয়োজনীয় টেলিভিশন দেখা, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় দেওয়া, উদ্দেশ্যহীন গেম খেলা, অপ্রয়োজনীয় আড্ডা, অতিরিক্ত ঘুম, রাত জাগা, অলসতা এবং কাজ ফেলে রাখার অভ্যাস সময় অপচয়ের বড় কারণ হতে পারে।
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) সময়ের অপচয়কে অত্যন্ত ক্ষতিকর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাই প্রয়োজন ছাড়া সময় নষ্ট হয়—এমন কাজ থেকে দূরে থাকা উচিত।
৬. অল্প সময়কেও কাজে লাগানো
অবসর সময়কে ছোট মনে না করে তা উপকারী কাজে ব্যয় করা উচিত। অল্প সময়েও কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া কিংবা জ্ঞানচর্চা করা যায়।
জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগানোর অভ্যাস সময়ের সঠিক ব্যবহারে সহায়তা করে।
৭. নামাজের সময়কে কেন্দ্র করে রুটিন তৈরি করা
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সময়ের শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১০৩)
নামাজের সময়কে কেন্দ্র করে দিনের কাজ ভাগ করে নিলে নিয়মিত জীবনযাপন সহজ হয়।
৮. কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা
সব কাজ একই মাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই কোন কাজ আগে করতে হবে এবং কোনটি পরে করা যাবে—তা নির্ধারণ করা জরুরি।
ইসলামি পরিভাষায় কাজের গুরুত্ব অনুযায়ী অগ্রাধিকার নির্ধারণকে ‘ফিকহুল আওলাউইয়্যাত’ বলা হয়। জরুরি ফরজ দায়িত্বের পর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করলে সময়ের সুষ্ঠু ব্যবহার সম্ভব হয়।
৯. অল্প সময়ে বেশি নেকির আমল করা
অল্প সময়েও বিভিন্ন ইবাদত ও জিকির করা যায়। ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ও ‘আল্লাহু আকবার’ পাঠের মাধ্যমে সওয়াব অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’সহ বিভিন্ন জিকিরের ফজিলত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। একইভাবে কোরআন তিলাওয়াতও গুরুত্বপূর্ণ আমল। তাই ব্যস্ততার মধ্যেও ছোট ছোট সময়কে ইবাদত ও কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
সময় চলে গেলে ফিরে আসে না
সময় এমন একটি সম্পদ, যা একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। অর্থ-সম্পদ হারিয়ে আবার অর্জন করা সম্ভব হলেও হারিয়ে যাওয়া সময় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবহার করা উচিত। ইবাদত, জ্ঞানচর্চা, পরিবার, কর্মজীবন ও মানুষের কল্যাণে সময় ব্যয় করার মাধ্যমে জীবনকে অর্থবহ করে তোলাই হতে পারে সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার।
ঢাকা এক্সপ্রেস/এসআই