শিরোনাম
সাইদুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৩:১০, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৩:১০, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ফাইল ছবি
ধর্ম মানুষের আত্মিক শান্তি, নৈতিকতা ও কল্যাণের পথ দেখায়। মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা, সততা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা ধর্মের অন্যতম প্রধান শিক্ষা। অথচ ধর্মের নামেই যখন মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি সত্যিই ধর্মের মূল শিক্ষা অনুসরণ করছি?
পৃথিবীতে নানা ধর্ম, মত ও বিশ্বাসের মানুষ বসবাস করেন। কারও ধর্ম ইসলাম, কারও হিন্দু, কারও বৌদ্ধ, কারও খ্রিষ্টান। আবার কেউ কোনো ধর্মে বিশ্বাস করেন না। বিশ্বাসের এই ভিন্নতা মানুষের স্বাভাবিক পরিচয়ের অংশ। তাই ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে ছোট করা, অবহেলা করা কিংবা তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা কখনোই ন্যায়সংগত হতে পারে না।
ধর্মের শিক্ষা মানবতা
ধর্মের বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এর নৈতিক শিক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের প্রতি সদাচরণ, অসহায়কে সাহায্য করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং সবার প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার শিক্ষা বিভিন্ন ধর্মেই গুরুত্ব পেয়েছে।
ইসলামে মানুষের মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন মানুষকে ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত ৮)। অর্থাৎ ব্যক্তিগত বিরাগ কিংবা পরিচয়ের পার্থক্য ন্যায়বিচারের পথে বাধা হতে পারে না।
হিন্দুধর্মের বিভিন্ন শিক্ষায় জীবের প্রতি দয়া ও সহমর্মিতার কথা বলা হয়েছে। বৌদ্ধধর্মে অহিংসা, করুণা ও মৈত্রীর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। খ্রিষ্টধর্মেও প্রতিবেশীকে ভালোবাসা এবং মানুষের সেবার শিক্ষা রয়েছে। এসব শিক্ষার মধ্যে একটি সাধারণ বার্তা স্পষ্ট—মানুষের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতা ছাড়া সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
বিশ্বাসের স্বাধীনতা ও পারস্পরিক সম্মান
ধর্মীয় সম্প্রীতি মানে সবাইকে একই বিশ্বাসে বিশ্বাসী হতে হবে, এমন নয়। বরং ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও অধিকারকে সম্মান করাই সম্প্রীতির ভিত্তি।
একজন মানুষ যে ধর্ম পালন করবেন, তা তার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও স্বাধীনতার বিষয়। অন্যের ওপর নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়া কিংবা ভিন্ন বিশ্বাসের কারণে কাউকে হেয় করা সমাজে বিভেদ বাড়ায়। একইভাবে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিদ্বেষ ছড়ানো, উপাসনালয়ে হামলা কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে সহিংসতা উসকে দেওয়া মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
বাংলাদেশের সমাজেও বিভিন্ন ধর্মের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করছেন। উৎসব-পার্বণে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো, বিপদে সহযোগিতা করা এবং সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা সম্প্রীতির বাস্তব উদাহরণ। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে করণীয়
ধর্মীয় বৈষম্য দূর করার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্র বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নয়; এটি প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। পরিবার থেকেই শিশুদের শেখাতে হবে, ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও সব মানুষের মর্যাদা সমান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহনশীলতা, মানবিকতা ও বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান চর্চা করতে হবে।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। যাচাই না করা ধর্মীয় তথ্য, উসকানিমূলক বক্তব্য কিংবা বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা মুহূর্তেই মানুষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে দিতে পারে। তাই কোনো তথ্য প্রচারের আগে সত্যতা যাচাই করা এবং বিভেদ সৃষ্টিকারী বক্তব্য এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।
পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদেরও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে। কোথাও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কেউ বৈষম্য বা নির্যাতনের শিকার হলে তার পাশে দাঁড়াতে হবে। আইনের দৃষ্টিতে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করা এবং অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার করাও জরুরি।
পরিচয় ভিন্ন, মানবতা এক
ধর্ম মানুষের বিশ্বাসের পরিচয় হতে পারে, কিন্তু মানুষের প্রতি আচরণই তার মানবিকতার পরিচয় তুলে ধরে। একজন মানুষের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার সততা, কাজ, নৈতিকতা ও অন্যের প্রতি আচরণের ভিত্তিতে—তার ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।
মত ও বিশ্বাসের পার্থক্য থাকতেই পারে। সেই পার্থক্যকে সংঘাতের কারণ না বানিয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহাবস্থানের সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে ওঠে তখনই, যখন মানুষ ভিন্নতাকে ভয় না পেয়ে সম্মান করতে শেখে।
ধর্মের নামে বৈষম্য নয়, বরং ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে মানবতা, ন্যায়বিচার ও সহমর্মিতার চর্চাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। বিশ্বাস যার যার, কিন্তু মানুষের মর্যাদা সবার—এই উপলব্ধি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলে ধর্মীয় সম্প্রীতি আরও দৃঢ় হবে এবং গড়ে উঠবে বৈষম্যহীন, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক পৃথিবী।
ঢাকা এক্সপ্রেস/এসআই