ঢাকা, রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

১৭ কার্তিক ১৪৩৩, ২০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

২জি থেকে ৪জি: প্রযুক্তির বদল, বাড়তি খরচের চাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১২:৪১, ১ নভেম্বর ২০২৬

২জি থেকে ৪জি: প্রযুক্তির বদল, বাড়তি খরচের চাপ

ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস

বাংলাদেশে ২জি মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে আধুনিক প্রযুক্তিতে যাওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে সাশ্রয়ী হ্যান্ডসেটের প্রাপ্যতা, গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতা এবং দেশীয় উৎপাদনশিল্পের প্রস্তুতি। প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের মাধ্যমে স্পেকট্রামের দক্ষ ব্যবহার ও উন্নত যোগাযোগসেবা নিশ্চিত করার সুযোগ থাকলেও দেশের প্রায় ৬ কোটি ফিচার ফোন ব্যবহারকারীকে নতুন প্রযুক্তিতে স্থানান্তর করতে প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ২০২৬ সালের ১৬ জুন সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে ২জি ব্যবহার কমিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিতে স্থানান্তর বিষয়ে একটি কর্মশালার আয়োজন করে। বিভিন্ন পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২৯, ২০৩০ ও ২০৩১ সালকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে আলোচনায় আনা হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রূপান্তর সম্পন্ন করতে হলে বিকল্প ফোনের সরবরাহ, নেটওয়ার্কের মান এবং গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের মানুষ, প্রবীণ নাগরিক এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো সাধারণ ফিচার ফোন ব্যবহার করেন। তাদের অনেকের জন্য মোবাইল ফোনের প্রধান প্রয়োজন ভয়েস কল ও দৈনন্দিন যোগাযোগ। ফলে শুধু প্রযুক্তি পরিবর্তনের নির্দেশনা দিয়ে তাদের নতুন হ্যান্ডসেট ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা কঠিন হতে পারে।

বর্তমানে একটি সাধারণ ২জি ফিচার ফোনের দাম প্রায় ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা। অন্যদিকে, ৪জি ফিচার ফোন কিনতে ব্যয় করতে হয় প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। অর্থাৎ নতুন প্রযুক্তিতে যেতে একজন গ্রাহকের অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা প্রয়োজন হতে পারে।

এই মূল্যপার্থক্য বিবেচনায় না নিয়ে দ্রুত ২জি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হলে নিম্ন আয়ের গ্রাহকেরা আর্থিক চাপে পড়তে পারেন। বিশেষ করে যারা শুধু কল করার জন্য ফোন ব্যবহার করেন, তাদের কাছে বাড়তি অর্থ ব্যয় করে নতুন হ্যান্ডসেট কেনার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করা জরুরি।

সংশ্লিষ্ট শিল্পের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক বছর আগে দেশীয় ৬-৭টি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দামের ৪জি ফিচার ফোন বাজারে এনেছিল। কিন্তু প্রত্যাশিত বিক্রি না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দিয়েও চাহিদা বাড়াতে হিমশিম খায়। দাবি করা হয়েছে, মূল্যছাড়ের পরও এসব মডেলের প্রায় ৩০ শতাংশ অবিক্রীত ছিল।

এ অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রযুক্তিগত বিকল্প তৈরি হলেই বাজারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চাহিদা সৃষ্টি হয় না। ফোনের দাম, ব্যবহারিক সুবিধা ও গ্রাহকের প্রয়োজনের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন।

দেশীয় হ্যান্ডসেট উৎপাদনশিল্পেও ২জি ফোনের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে উৎপাদিত হ্যান্ডসেটের প্রায় ৬৪ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল ২জি ফিচার ফোন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত এ হার ছিল প্রায় ৬৬ দশমিক ২ শতাংশ। তবে নীতিগত সিদ্ধান্তে ব্যবহারের আগে এসব পরিসংখ্যানের মূল উৎস ও হিসাবপদ্ধতি যাচাই করা প্রয়োজন।
তথ্যগুলো সঠিক হলে ২জি ফোনের উৎপাদন সীমিত করার সিদ্ধান্ত দেশীয় শিল্পে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৭ সাল থেকে উৎপাদন বা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হলেও ২০২৯ সাল পর্যন্ত চাহিদা অব্যাহত থাকলে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বৈধ উৎপাদন কমে যাওয়ার পরও গ্রাহকের চাহিদা বজায় থাকলে অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ আমদানি বাড়তে পারে। এতে বৈধ উৎপাদক ও আমদানিকারকেরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন। একই সঙ্গে সরকার রাজস্ব হারাতে পারে এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মী, যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

বাংলাদেশের স্মার্টফোন বাজারে অবৈধ হ্যান্ডসেট বিক্রির হার প্রায় ৪০ শতাংশ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে যে হিসাব উল্লেখ করা হয়, তার সময়কাল ও পরিমাপপদ্ধতি যাচাই করা প্রয়োজন। তবে অবৈধ আমদানি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে বৈধ বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার পর অনানুষ্ঠানিক বাজার সম্প্রসারণের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এ কারণে ২জি ফোনের উৎপাদন ও আমদানি নিয়ন্ত্রণের সময়সূচির সঙ্গে দেশীয় উৎপাদকদের নতুন প্রযুক্তিতে রূপান্তর, অবৈধ হ্যান্ডসেট প্রতিরোধ এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষার পরিকল্পনাও যুক্ত করা প্রয়োজন।

৪জি ফিচার ফোনের উৎপাদন ব্যয় কমানো গেলে গ্রাহকের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। এ জন্য যন্ত্রাংশ আমদানিতে যৌক্তিক শুল্কসুবিধা, উৎপাদন প্রণোদনা, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়নের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে মোবাইল অপারেটরদেরও এগিয়ে আসতে হবে। সাশ্রয়ী ভয়েস প্যাকেজ, বিশেষ কলরেট, ভিওএলটিই-সমর্থিত সেবা, কিস্তিতে হ্যান্ডসেট কেনার সুযোগ এবং স্বল্পসুদের অর্থায়ন গ্রাহকের জন্য রূপান্তর সহজ করতে পারে। অতি নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে প্রকৃত উপকারভোগী চিহ্নিত করে লক্ষ্যভিত্তিক সরকারি ভর্তুকিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে শুধু সাশ্রয়ী ফোন বাজারে আনলেই হবে না। গ্রাহককে নতুন প্রযুক্তির বাস্তব সুবিধা পেতে হবে। উন্নত কলের মান, নির্ভরযোগ্য সংযোগ এবং সহনীয় যোগাযোগ ব্যয় নিশ্চিত করা গেলে নতুন ফোন কেনার আগ্রহ বাড়তে পারে।

২জি বন্ধের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিকল্প নেটওয়ার্কের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা। ৪জি-সমর্থিত ফোন থাকলেই নিরবচ্ছিন্ন ভয়েস কল পাওয়া যায় না। এর জন্য পর্যাপ্ত নেটওয়ার্ক কাভারেজ, স্থিতিশীল সংযোগ, হ্যান্ডসেটের সামঞ্জস্য এবং অপারেটরের ভয়েস ওভার এলটিই (ভিওএলটিই) সেবা কার্যকর থাকা প্রয়োজন।

বিভিন্ন এলাকায় ৪জি নেটওয়ার্কের মান নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ থাকলে তা সমাধান না করে ২জি বন্ধ করা হলে নতুন ফোন কেনার পরও ব্যবহারকারীরা সমস্যায় পড়তে পারেন। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে নেটওয়ার্কের বাস্তব সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি।

বিটিআরসি অপারেটরভিত্তিক নেটওয়ার্ক পরীক্ষা, স্বাধীনভাবে সেবার মান মূল্যায়ন এবং গ্রাহকের অভিযোগ পর্যালোচনার মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিটি অপারেটরের প্রস্তুতি আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে, কারণ একটি অপারেটরের ভালো কাভারেজ অন্য অপারেটরের সমমানের সেবা নিশ্চিত করে না।

সারা দেশে একই সময়ে ২জি বন্ধ করার পরিবর্তে পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ধাপে ধাপে এগোনোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথম পর্যায়ে ঢাকা মহানগরীর এমন কিছু এলাকায় ২জি সেবা সীমিত বা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যেখানে সংশ্লিষ্ট অপারেটরের ৪জি নেটওয়ার্কের মান স্বাধীন পরীক্ষায় সন্তোষজনক প্রমাণিত হবে।

পরীক্ষার আগে গ্রাহকদের পর্যাপ্ত সময় দিয়ে জানানো এবং বিকল্প হ্যান্ডসেট ও সংযোগ পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে গ্রাহকের স্থানান্তরের হার, ভিওএলটিইর কার্যকারিতা, সংযোগের সমস্যা, জরুরি যোগাযোগের সক্ষমতা, ফোনের দাম ও প্রাপ্যতা এবং গ্রাহকের অভিযোগ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

ফলাফল সন্তোষজনক হলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য মহানগর, জেলা সদর, উপজেলা সদর এবং পরে গ্রামীণ এলাকায় কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।

লক্ষ্য হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশব্যাপী রূপান্তর বিবেচনা করা হলেও সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে বাস্তব প্রস্তুতির ভিত্তিতে। প্রয়োজনে পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের ফলাফল ও বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী সময়সূচি পরিবর্তনের সুযোগ রাখা উচিত।

২জি থেকে ৪জি-তে স্থানান্তর শুধু নেটওয়ার্ক পরিবর্তন বা পুরোনো হ্যান্ডসেটের ব্যবহার বন্ধের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কোটি মানুষের যোগাযোগের ব্যয়, দেশীয় উৎপাদনশিল্পের ভবিষ্যৎ এবং বৈধ বাজারের স্থিতিশীলতা।

সরকার, বিটিআরসি, মোবাইল অপারেটর, হ্যান্ডসেট উৎপাদক, আমদানিকারক ও ভোক্তা প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এতে সাশ্রয়ী ফোনের সরবরাহ, নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, গ্রাহক সহায়তা, অবৈধ আমদানি প্রতিরোধ এবং দেশীয় শিল্পের রূপান্তরকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন তখনই টেকসই হবে, যখন সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারবেন, নির্ভরযোগ্য সেবা পাবেন এবং দেশীয় উৎপাদনশিল্পও পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে। তাই ২জি বন্ধের সিদ্ধান্তের আগে গ্রাহক ও বাজারের প্রস্তুতি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার।

ঢাকা এক্সপ্রেস/এসএস

আরও পড়ুন