ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১২ আশ্বিন ১৪৩৩, ১৪ রবিউস সানি ১৪৪৮

গবিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ, শিক্ষককে হেনস্তা

গবি প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১২:১৯, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১২:২০, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গবিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ, শিক্ষককে হেনস্তা

ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস

ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলার মাঠে বিরোধের জেরে শিক্ষার্থীদের দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ফার্মেসি বিভাগের এক শিক্ষককে ধাক্কা দিয়ে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। পরে মাঠের বাইরেও বাদামতলা নামক স্থানে তারা ফের মুখোমুখি হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) আশুলিয়ার নলাম এলাকায় গণ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে এ ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা জানান, সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি ও মেডিকেল ফিজিক্স বিভাগের নারী শিক্ষার্থীদের ফুটবল খেলা চলছিল। এ সময় মাঠে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (বিবিএ) বিভাগের শিক্ষার্থী আকাশ ও মেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং (এমপিবিএমই) বিভাগের শিক্ষার্থী ইমনের মধ্যে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডা থেকে ধাক্কাধাক্কি হয়।

পরে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ জানাতে ইমন তাঁর বিভাগীয় প্রধানের কক্ষে যান। ওই কক্ষে তখন ইমন, বিজয়, নকিব, রাকিবসহ আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী কথা বলছিলেন। এ সময় বিবিএ বিভাগের আকাশ, তামিমসহ আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁদের ওই কক্ষ থেকে বের করে আনেন বলে জানা গেছে। এরপর শিক্ষক করিডরে তাঁদের মধ্যে আবারও সংঘর্ষ হয়।

ঘটনার সময় মাঠের পাশে উপস্থিত ফিজিক্যাল ইন্সট্রাক্টর খাদিজা খাতুন বলেন, খেলা পরিচালনার সময় তিনি মাইক্রোবায়োলজি ও মেডিকেল ফিজিক্স বিভাগের দর্শকদের মাঠের নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে বলছিলেন। তিনি দুই দলের দর্শকদেরই একই কথা বলেছিলেন। কিন্তু এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।

একপর্যায়ে সাদা শার্ট পরা মেডিকেল ফিজিক্স বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে সেখান থেকে চলে যেতে বললে তিনি অন্যদেরও চলে যেতে বলেন। এ সময় তাঁর পেছনে থাকা বিবিএ বিভাগের আকাশ ওই শিক্ষার্থীকে চলে যেতে বলেন। তখন আকাশের সঙ্গে ওই শিক্ষার্থীদের তর্ক শুরু হয়। পরে তর্ক-বিতর্ক থেকে ধস্তাধস্তি হয়।

পরে শিক্ষার্থীরা হাবিব স্যারের (সিনিয়র ফিজিক্যাল ইন্সট্রাক্টর) কাছে গিয়ে মাঠে বহিরাগত থাকার অভিযোগের বিচার চান। তখন স্যার তাঁদের বলেন, খেলা চলার সময় বৃষ্টি ছিল। তাই তখন কারা উপস্থিত ছিলেন, তা তিনি বলতে পারবেন না।

মেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং (এমপিবিএমই) বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দিন বলেন, মাঠের ঘটনার পর পরিস্থিতি শান্ত করতে তিনি তাঁর বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে কেবিনে ডেকে বুঝিয়েছেন, কোনো অন্যায় হয়ে থাকলে সরি বলতে। সরি বললে কেউ ছোট হয়ে যায় না। তাঁরা বিষয়টি বুঝেছিলেন এবং সরি বলতে রাজিও হয়েছিলেন।

তিনি বলেন, এর মধ্যেই কয়েকজন শিক্ষার্থী এসে তাঁদের কক্ষ থেকে টেনে করিডোরে নিয়ে মারধর করেন। মাইক্রোবায়োলজিসহ কয়েকটি বিভাগের শিক্ষার্থী এতে ছিলেন বলে তাঁকে জানানো হয়েছে। তাঁদের কয়েকজন শিক্ষকও শিক্ষার্থীদের থামানোর চেষ্টা করেছেন এবং ধাক্কাধাক্কির শিকার হয়েছেন।

অধ্যাপক সালাউদ্দিন বলেন, এভাবে শিক্ষকের কক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের টেনে নিয়ে করিডোরে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হবে, এটি তিনি কখনো চিন্তাও করেননি। এমন ঘটনা তিনি আগে কখনো দেখেননি।

তিনি আরও বলেন, ক্লাস বয়কট না করতেও তিনি শিক্ষার্থীদের বারবার অনুরোধ করেছেন। তাঁরা ক্লাস বয়কট করবেন না বলে তাঁকে জানিয়েছিলেন। বিষয়টি উপাচার্য ও প্রক্টর কমিটি পর্যন্ত গেছে এবং সমাধানের চেষ্টা চলছে। তাই ক্লাস বয়কট কোনো সমাধান নয়। তিনি এটিকে সমর্থন করেন না।

মারধর করার অভিযোগ ওঠা বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (বিবিএ) বিভাগের শিক্ষার্থী তামিম ইকবাল বলেন, আকাশ তাঁর জুনিয়র। ঘটনার কথা জানতে পেরে তিনি প্রশাসনিক ভবন থেকে বের হয়ে আকাশের সঙ্গে দেখা করেন। আকাশের কাছ থেকে মাঠে তর্ক-বিতর্ক ও তাঁকে মারধরের কথা শুনে তিনি আরও দুই-তিনজনের সঙ্গে মেডিকেল ফিজিক্স বিভাগে যান।

তামিম বলেন, সেখানে বিজয়ের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তাঁর বন্ধু, সিনিয়র-জুনিয়রেরা তাঁদের ভেতরে ঢুকতে বা আলোচনা করতে দিতে চাইছিলেন না। একপর্যায়ে তর্ক-বিতর্ক ও ধাক্কাধাক্কি হয়। তাঁরা দুই-তিনজন ছিলেন। অন্যদিকে সেটি তাঁদের বিভাগ হওয়ায় ওই পক্ষের লোকজন বেশি ছিল।

এ বিষয়ে আকাশের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

এদিকে শিক্ষক করিডরে সংঘর্ষ থামাতে গেলে ফার্মেসি বিভাগের এক শিক্ষককে হেনস্তা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

হেনস্তার শিকার ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষক অনন্ত কুমার দাশ বলেন, প্রথমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাঠে একবার বাগ্‌বিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কি হয়। এরপর তিনি করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। শিক্ষার্থীরা আবারও ঝামেলা করতে যাচ্ছে বুঝতে পেরে তিনি তাঁদের থামানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁরা তাঁকে ধাক্কা দিয়ে চলে যান এবং কুরুচিপূর্ণ কথা বলেন। ঘটনার কিছুক্ষণ পর শিক্ষার্থীরা এসে তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে যান।

পরে কোনোভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা নিচে নেমে বাদামতলা দিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। এ সময় ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থীরা তাঁদের আটকে শিক্ষককে কেন ধাক্কা দেওয়া হয়েছে, তা জানতে চান। এতে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে সেখানে উপস্থিত গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (গকসু) ভিপিসহ আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁদের থামিয়ে দেন বলে জানা গেছে।

ঘটনায় মারধরের শিকার হওয়ার অভিযোগ ওঠা মেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং (এমপিবিএমই) বিভাগের সপ্তম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী রিফাত এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, ‘আমি কালকের বিষয়টা নিয়ে কোনো ধরনের কথা বলতে চাচ্ছি না। আমরা বিষয়টা একদমই স্কিপ করতে চাই। তবে ভবিষ্যতে যদি মনে হয়, তাহলে আপনাকে ইনফর্ম করব।’

এ ঘটনায় মারধরের শিকার হওয়ার অভিযোগ ওঠা এমপিবিএমই বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী বিজয় প্রথমে এ বিষয়ে কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি গণ বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির (জিবিডিএস) সাধারণ সম্পাদক।

পরে গণ বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির (জিবিডিএস) এক বিবৃতিতে জানানো হয়, বিজয় হোসেনের সঙ্গে মিটিং চলাকালে হামলা, শিক্ষকদের গালিগালাজ ও অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনায় তারা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়। এ ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে সহিংসতা ও বহিরাগতদের প্রবেশ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

এ ঘটনার পর সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে ফার্মেসি ও মেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা সব ক্লাস বর্জন করেছেন।

সহকারী প্রক্টর জামিনুর ইসলাম বলেন, ‘ঘটনা আমরা অবগত আছি। ঘটনা শোনার পরে আমরা দ্রুত জরুরি মিটিংয়ে বসে আলোচনা করেছি। যে বা যারা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী যে শাস্তির বিধান রয়েছে, তা নিশ্চিত করা হবে।’

ঢাকা এক্সপ্রেস/এসএস

আরও পড়ুন