শিরোনাম
জাককানইবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২:১৫, ৬ নভেম্বর ২০২৬
ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস
১৪ অক্টোবরের সংঘর্ষে আহত দুই শিক্ষার্থীর একজন এখনো মাথার আঘাত ও শারীরিক জটিলতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। অন্যজন বিশ্ববিদ্যালয়ের কক্ষে অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অথচ ঘটনার তিন সপ্তাহের বেশি সময় পার হলেও তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এতে বিচার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাককানইবি) সংঘর্ষের ঘটনায় প্রশাসনের কাছ থেকে মামলা করার অনুমতি না পাওয়া, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা এবং নতুন করে হুমকি-হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন আহত ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে দ্রুত বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা। তবে তদন্ত কমিটির দাবি, কারও বক্তব্য বা তথ্য বাদ না দিয়ে যাচাই-বাছাই শেষ করেই দায়ীদের বিষয়ে সুপারিশ করা হবে।
গত ১৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে নজরুল প্রিমিয়ার লীগ (এনপিএল) ক্রিকেট টুর্নামেন্ট চলার সময় ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধের সূত্রপাত হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। একপর্যায়ে কলা ভবনের সামনে হামলার শিকার হন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিব হোসেন, আসাদুর রহমান রবিউলসহ কয়েকজন। তাদের মধ্যে সাকিব রড ও স্টাম্পের আঘাতে জ্ঞান হারান। মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া রবিউলের অস্ত্রোপচারও করাতে হয়।
সাকিবের অভিযোগ, সংঘর্ষের পরিস্থিতি দেখে তিনি নিজের বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে সেখান থেকে সরে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর একদল শিক্ষার্থী তাকে ঘিরে ধরে। তাদের একজন ‘এটাও ইংলিশের, এটারে ধর’ বলে তাকে শনাক্ত করেন। প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করলেও তাকে ড্রেনের ওপর ফেলে মাথায় পরপর তিনটি আঘাত করা হয়। এতে তিনি জ্ঞান হারান। তার দাবি, অচেতন অবস্থাতেও তাকে মারধর করা হয়েছে। জ্ঞান ফেরার পরও লাথি মারা হয়।
আগামীর সময়ের প্রতিনিধির কাছে সাকিব জানান, ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন তাকে সংঘর্ষে জড়িত নন বলে জানানোর পরও হামলাকারীরা থামেননি। অ্যাম্বুলেন্সে নেওয়ার সময় হামলার কারণ জানতে চাইলে তাকে বলা হয়েছিল, ‘তোর হাতে রড ছিল কেন?’ অথচ তার দাবি, হাতে কোনো রড ছিল না।
সহপাঠী থেকে শুরু করে সিনিয়র ও জুনিয়রদের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকার কথা উল্লেখ করে সাকিব বলেন, কারও সঙ্গে বিরোধ না থাকা সত্ত্বেও তাকে কেন এভাবে হামলার শিকার হতে হলো, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তার ভাষায়, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়ে তোমরা আমার জীবনটা এলোমেলো করে দিয়েছ। আমার পুরো পরিবারের সুখ-শান্তি কেড়ে নিয়েছ তোমরা।’ বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত হলেও আঘাতজনিত শারীরিক সমস্যা থেকে এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি তিনি।
এদিকে একই ঘটনায় আহত রবিউলের শারীরিক অবস্থার নতুন করে অবনতি হয়েছে। গত ৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ কক্ষে মাথা ঘুরে জ্ঞান হারালে প্রথমে তাকে ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
পরদিন সংবাদ সম্মেলনে রবিউল অভিযোগ করেন, ১৪ অক্টোবরের ঘটনাকে দুই পক্ষের সাধারণ মারামারি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলছে। তার মতে, এটি কোনো সাধারণ সংঘর্ষ নয়; বরং একপক্ষের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও হত্যাচেষ্টার ঘটনা। ঘটনার পরও তারা হুমকি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি। অথচ অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ক্যাম্পাসে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছেন।
রবিউলের অভিযোগ, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করতে চাইলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সম্মতি দেয়নি। উল্টো তদন্তের নামে ভুক্তভোগীদের কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে, তারা কেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে একই অভিযোগ করেন মার্কেটিং বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তানভির আহমেদ তুর্য। তার দাবি, মামলা করার পরিবর্তে তদন্তের কথা বলে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে এবং যারা হামলার শিকার হয়েছেন, তাদেরই জবাবদিহির মুখোমুখি করা হচ্ছে। প্রশাসনের সহযোগিতা না পেলেও তারা বিচার আদায়ে পিছপা হবেন না বলে জানান তিনি।
সংঘর্ষের পরদিন ১৫ অক্টোবর সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর আগে হাসপাতালে আহতদের দেখতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইমদাদুল হুদা, প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে কথা বলেন। সে সময় শিক্ষার্থীরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তদন্ত কমিটিকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তবে ১৬ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত দুর্গাপূজার ছুটি থাকায় ওই সময়কে কর্মদিবসের হিসাবে ধরা হয়নি। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় ২৮ অক্টোবর প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে কথা বলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন জড়িতদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। তিনি জানান, তদন্ত কমিটির সুপারিশসহ প্রতিবেদন শৃঙ্খলা বোর্ডে উপস্থাপন করা হবে। পরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চূড়ান্ত শাস্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এর আগে উপাচার্য জানিয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না। তদন্তের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের সদস্যও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে তদন্তের চূড়ান্ত ফল সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনে প্রকাশ করা হবে কি না, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি।
তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেন, নির্ধারিত পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য গ্রহণ, সাক্ষ্য সংগ্রহ এবং পাওয়া তথ্য যাচাই করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হয়েছে। ৫ নভেম্বর তথ্য সংগ্রহের শেষ দিন হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, এরপর কমিটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে। ঘটনায় যার যতটুকু সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, সেই অনুপাতে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো সংশয় নেই দাবি করে অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, কমিটি কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করছে না এবং বাইরের কোনো প্রভাবেও তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে না।
তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও দাবির পরিধি কেবল হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সংঘর্ষের আগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ভূমিকা কী ছিল, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে কতটা কার্যকর ছিলেন এবং সংঘর্ষ ঠেকাতে কোনো প্রশাসনিক অবহেলা ছিল কি না, সেসব বিষয়ও সামনে আনছেন তারা। প্রক্টরের পদত্যাগের দাবি প্রসঙ্গে উপাচার্য এর আগে প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘প্রক্টর পদত্যাগ করলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে?’ তবে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা ও জবাবদিহির প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ এখনো কাটেনি।
সংঘর্ষের পর আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার লড়াই চলছে। একই সঙ্গে তদন্তের অগ্রগতি, মামলা করতে প্রশাসনের অবস্থান এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা—কোনোটিরই চূড়ান্ত পরিণতি এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে উপাচার্যের সর্বোচ্চ শাস্তির আশ্বাস এবং তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতার দাবি বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, তদন্তের ফল কেবল দায়ীদের চিহ্নিত করেই শেষ হবে না; সংঘর্ষ প্রতিরোধে প্রশাসনিক কোনো ব্যর্থতা থাকলে সেটিও সামনে আসবে।
ঢাকা এক্সপ্রেস এর ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করুন।
ঢাকা এক্সপ্রেস/এসএস