ঢাকা, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

১৯ আশ্বিন ১৪৩৩, ২১ রবিউস সানি ১৪৪৮

চাঁদার জুলুমে ঘরবাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ, ফুঁসছে পাবনারটেক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৫:৩৩, ২০ এপ্রিল ২০২৬

চাঁদার জুলুমে ঘরবাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ, ফুঁসছে পাবনারটেক

ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস

রাজধানীর উত্তরার তুরাগ থানাধীন বাউনিয়া এলাকার পাবনারটেকে সড়ক উন্নয়নের নামে জোরপূর্বক চাঁদা আদায়, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, জমি দখল এবং অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী আমলের এমপি-মন্ত্রীদের সাথে চলাফেরা করা ফ্যাসিস্টদের কিছু দোসররা বর্তমানে বিএনপির নাম ধারণ করে এ কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং একই সাথে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) অঞ্চল-৬-এর কিছু অসাধু কর্মকর্তারাও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন এর সাথে। 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পশ্চিম পাশে অবস্থিত পাবনারটেক এলাকা দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকলেও সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন রাস্তা উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ দেয়। কিন্তু এই উন্নয়ন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে ‘উন্নয়ন কমিটি’ নামের একটি সংগঠন গঠন করে স্থানীয়দের কাছ থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। 

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতিটি পরিবার বা বাড়ির মালিকের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বুলডোজার দিয়ে ঘরবাড়ির অংশবিশেষ ভেঙে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দা লুৎফুন নাহার জানান, তার কাছে ১৫ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। তিনি টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তার পাঁচতলা ভবনের গেটের চ্যানেল ও পয়ঃনিষ্কাশন পাইপসহ বাড়ির সামনের বেশ কিছু অংশ ভেঙে ফেলা হয়, যাতে তার প্রায় ২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

এদিকে আরেক ভুক্তভোগী নারী অভিযোগ করেন, অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়ার মধ্যেই তার কাছ থেকেও তিন হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা দিতে না পারায় তার বসতঘরের একাংশ ভেঙে ফেলে জমি দখল করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তার সোয়া দুই শতাংশ জমির মধ্যে সোয়া এক শতাংশই রাস্তার নামে দখল করা হয়েছে।

তিনি আরো অভিযোগ করেন, এ বিষয়ে মামলা করতে গেলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন অঞ্চল-৬ এর সড়ক পরিদর্শক ফারুক তাকে নিরুৎসাহিত করেন। 

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সংশ্লিষ্ট সড়ক পরিদর্শক ফারুক বলেন, ‘যার যার বাড়ি, সে নিজেই ভাঙছে। অন্য কেউ ভাঙেনি।’

ভুক্তভোগী স্বপ্না আক্তার অভিযোগ করেন, তার বাড়িঘর ভাঙচুরের সময় তাকে শারীরিকভাবেও লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করা হয়। তার দাবি, রাস্তার পাশে খালি প্লট থাকা সত্ত্বেও দরিদ্র ও অসহায় মানুষের ঘরবাড়ি ভেঙে তাদের জমি দখল করা হচ্ছে।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন এলাকার আরো কয়েকজন বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ী।

অন্যদিকে, জমি দখলের অভিযোগে আমেনা খাতুন নামের এক ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর হাইকোর্ট ৬০ দিনের মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে রাতের আঁধারে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে রাস্তার কাজ সম্পন্ন করা হয়।

তাদের অভিযোগ, নির্ধারিত মানের তুলনায় রাস্তা নির্মাণে কম রড, সিমেন্ট ও বালু ব্যবহার করা হয়েছে, যা সড়কের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। স্থানীয়দের দাবি, রাস্তার কাজ চলাকালে রাতের আধাঁরে ডিএনসিসি অঞ্চল-৬-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন উর রশিদ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। এ বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এমনকি বিভিন্ন সময়ে তাকে ফোন কল ও হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাসেজ করলেও কোন প্রকার রেসপন্স করেননি নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন উর রশিদ। 

অভিযোগ প্রসঙ্গে পাবনারটেক উন্নয়ন কমিটির সভাপতি রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘সিটি করপোরেশনকে চৌদ্দ লাখ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে রাস্তার কাজ শুরু করানো হয়েছে।’

অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক ফরিদ উদ্দিন দাবি করেন, ‘এলাকার মানুষের সম্মতিতেই উন্নয়নের জন্য টাকা তোলা হয়েছে।’

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা দাবি করেন, চাঁদাবাজির টাকার একটি অংশ ঘুষ হিসেবে ব্যবহার করে সিটি করপোরেশনের কিছু কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করেছে কথিত উন্নয়ন কমিটি।

এলাকাবাসীর দাবি, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে প্রভাবশালী চক্রটি উল্টো তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করছে।

উন্নয়নের নামে চাঁদাবাজি, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, জমি দখল, হামলা-মামলা, ঘুষ বাণিজ্য এবং নির্মাণ কাজে অনিয়ম—এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে পাবনারটেক এলাকায় চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। 

স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত সুষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।

ঢাকা এক্সপ্রেস/ইউকে

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন