ঢাকা, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬

১৮ আশ্বিন ১৪৩৩, ২০ রবিউস সানি ১৪৪৮

গরু নেই, তবু মণকে মণ ‘দুধ’ তৈরি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৬:৩০, ৩ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৬:৪৯, ৩ অক্টোবর ২০২৬

গরু নেই, তবু মণকে মণ ‘দুধ’ তৈরি

ছবি : সংগৃহীত

ফার্মে নেই গরু। নেই দুধ দোহনের কোনো ব্যবস্থা। অথচ প্রতিদিন মণকে মণ ‘দুধ’ তৈরি হচ্ছে। পরে সেই তরল পৌঁছে যাচ্ছে বিভিন্ন নামিদামি প্রতিষ্ঠানের চিলিং সেন্টারে।সয়াবিন তেল, গ্লুকোজ, স্যাকারিন, ইউরিয়া সার, ডিটারজেন্ট পাউডার ও কস্টিক সোডাসহ বিভিন্ন রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে এই নকল দুধ। পরে বাহারি মোড়কে তা পৌঁছে যাচ্ছে শিশু, রোগীসহ সাধারণ মানুষের কাছে।

পাবনার ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর ও ফরিদপুরে নামে-বেনামে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক চিলিং সেন্টার। এগুলো দুধের মান যাচাই ও প্রাথমিক সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়।

এসব চিলিং সেন্টারের মধ্যে ৯২টি বিভিন্ন স্বনামধন্য কোম্পানির। বাকিগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন। এ ছাড়া সাঁথিয়া, বাঘাবাড়ী ও বেড়া উপজেলাতেও রয়েছে অসংখ্য চিলিং সেন্টার।

ভেজাল কারবারিদের তথ্য অনুযায়ী, ৪০ লিটার ননিবিহীন সাদা পানিতে মাত্র ৪৫০ টাকার রাসায়নিক মেশানো হয়। এরপর সেটিকে উচ্চফ্যাটযুক্ত দুধ হিসেবে তৈরি করা হয়।

এই নকল দুধ বাজারে প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়। এতে প্রতি ৪০ লিটারে প্রায় ১ হাজার ৭৫০ টাকা মুনাফা হয় বলে জানান কারবারিরা।

তাদের দাবি, এভাবে প্রতিদিন মণকে মণ নকল দুধ তৈরি করে মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করা যায়। বছরে একবার ধরা পড়লেও সর্বোচ্চ লাখ টাকা জরিমানা দিতে হয়। ফলে শাস্তির ভয়ও তেমন নেই।

নকল দুধ তৈরির রাসায়নিক সংগ্রহের প্রক্রিয়া সম্পর্কে কারবারিরা বিস্তারিত বলতে চাননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জানান, ফোন বা অনলাইনে অর্ডার করে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এসব রাসায়নিক কেনা যায়।

কুরিয়ারের মাধ্যমে সেগুলো পৌঁছে যায় কারখানায়। এরপর কৃত্রিম দুধ চিলিং সেন্টারে সরবরাহ করতে গুনতে হয় ঘুষ। কারবারিদের ভাষ্য, ৫০০ টাকা দিলেই খুলে যায় চিলিং সেন্টারের দরজা।

তাদের অভিযোগ, কম দামের কারণে বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের স্থানীয় সংগ্রাহকেরাও জেনে-বুঝে এই ক্ষতিকর তরল কিনছেন।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর বেড়া পেচাকোলা ঘাট এলাকায় উত্তম ঘোষ ও পলি ঘোষ দম্পতিকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেছে প্রশাসন। এর আগে ৬ সেপ্টেম্বর সাঁথিয়ার নাগডেমড়া এলাকায় জুঁই ডেইরি ফার্মের মালিককে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

এ ছাড়া ফরিদপুরের কেয়া ডেইরি, আমিনা ডেইরি, প্রিমিয়াম ফুড, বেড়ার জয়দেব ঘোষ এবং ভাঙ্গুড়ার সিংগাড়ি গ্রামের আশরাফুল আলীর বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বেড়ার নাকালিয়া ও পেচাকোলা বাজারে ১২ বছর ধরে ভেজাল দুধ তৈরির অভিযোগে জয়দেব ঘোষকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

ভেজাল দুধের দৌরাত্ম্যে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন প্রকৃত খামারিরা। তাদের অভিযোগ, খাঁটি দুধের দাম বেশি হওয়ায় চিলিং সেন্টারগুলো তা কিনতে চায় না।

ঘুষ না দেওয়ায় প্রকৃত খামারিদের দুধও অনেক সময় সংগ্রহ করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি সিন্ডিকেট কমিশন না পেলে খামারিদের কোণঠাসা করে রাখে বলেও অভিযোগ তাদের।

বাওইখোলা গ্রামের দুগ্ধ খামারি আশরাফুল ইসলাম বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা নকল দুধ কম দামে বিক্রি করায় প্রকৃত খামারিদের বাজার নষ্ট হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রতি লিটার ৫০ থেকে ৫৫ টাকা দরে দুধ বিক্রি করেও উৎপাদন খরচ উঠছে না। প্রশাসন দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এ অঞ্চলের দুগ্ধশিল্প ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও প্রান্তিক খামারিদের তথ্য অনুযায়ী, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে চার লাখ লিটার দুধের চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে উৎপাদন হয় প্রায় সাড়ে তিন লাখ লিটার।

উৎপাদিত দুধের মধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ লিটার সংগ্রহ করে মিল্ক ভিটা। আফতাব, আকিজ, প্রাণ, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান নেয় প্রায় পৌনে দুই লাখ লিটার।

এ ছাড়া পাইকাররা প্রতিদিন ৫০ থেকে ৫৫ হাজার লিটার এবং দুই শতাধিক মিষ্টির দোকান প্রায় ১৫ হাজার লিটার দুধ কেনে। হাট-বাজারের স্থানীয় ক্রেতারা নেন প্রায় ১০ হাজার লিটার।

সব মিলিয়ে প্রতিদিন দুধের ঘাটতি থাকে প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ হাজার লিটার। অভিযোগ রয়েছে, এই ঘাটতির সুযোগ নিয়েই নকল দুধ তৈরি করে বাজারে সরবরাহ করছেন অসাধু কারবারিরা।

ঢাকা এক্সপ্রেস/এসআই

আরও পড়ুন