শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৩:০১, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস
ঢাকার ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিন হাজারো রিকশা চলাচল করে। কখনো সরু গলিতে, কখনো বাজারের ভিড়ে, আবার কখনো যানজটে আটকে থাকা গাড়ির পাশ দিয়ে এগিয়ে চলে রিকশা। নগরজীবনের এই পরিচিত বাহনটি শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, ঢাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রিকশার ঘণ্টির শব্দ, রঙিন পেছনের কাঠামো আর চালকের প্যাডেল চালানোর দৃশ্য ঢাকার নিজস্ব এক পরিচয় তৈরি করেছে। সময়ের সঙ্গে শহর বদলেছে, বেড়েছে গাড়ি ও গণপরিবহন। কিন্তু ঢাকার অলিগলি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে রিকশার গুরুত্ব এখনো অটুট।
ঢাকায় রিকশার আগমন
রিকশার উৎপত্তি জাপানে। উনিশ শতকের শেষভাগে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রিকশার প্রচলন শুরু হয়। পরে এটি দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকায় রিকশার আগমন ঘটে ব্রিটিশ শাসনামলের শেষদিকে। ১৯৩০-এর দশকে শহরে রিকশার ব্যবহার শুরু হয় বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রথমদিকে রিকশা ছিল মূলত শহরের অভিজাত ও মধ্যবিত্ত মানুষের স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের বাহন।
তখন ঢাকার আয়তন ছিল ছোট। শহরের অনেক রাস্তা ছিল সরু ও কাঁচা। এসব পথে বড় যানবাহনের চেয়ে রিকশা চলাচল ছিল সহজ। ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে রিকশার ব্যবহার বাড়তে থাকে।
দেশভাগের পর দ্রুত বিস্তার
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ঢাকার জনসংখ্যা ও নগরায়ণ বাড়তে শুরু করে। নতুন নতুন এলাকা গড়ে ওঠে। মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজনও বাড়ে। এ সময় রিকশা হয়ে ওঠে শহরের অন্যতম প্রধান বাহন।
পরবর্তী সময়ে ঢাকার জনসংখ্যা আরও বাড়ে। কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও আবাসিক এলাকার মধ্যে যোগাযোগের জন্য রিকশার ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়। বিশেষ করে সরু রাস্তা, ছোট গলি ও যানজটপূর্ণ এলাকায় রিকশা হয়ে ওঠে সহজ ও কার্যকর পরিবহন।
রিকশা চালানোও অনেক মানুষের জীবিকার উৎসে পরিণত হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ ঢাকায় এসে রিকশা চালানোর কাজে যুক্ত হন। তাদের শ্রমে সচল থাকে নগরের অসংখ্য পথ ও মহল্লা।
রিকশার গায়ে ঢাকার শিল্প
ঢাকার রিকশাকে অন্য অনেক দেশের রিকশা থেকে আলাদা করেছে এর নকশা ও অলংকরণ। রিকশার পেছনের কাঠের অংশে ফুল, পাখি, গ্রামবাংলার দৃশ্য, সিনেমার চরিত্র, পশুপাখি কিংবা নানা রঙের চিত্র আঁকা হয়।
এই চিত্রকর্মকে অনেকেই ‘রিকশা আর্ট’ নামে চেনেন। এতে ফুটে ওঠে বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, মানুষের কল্পনা এবং শহুরে জীবনের নানা গল্প। রিকশার পেছনের ছোট্ট জায়গাটি যেন একেকটি চলমান ক্যানভাস।
রিকশা আর্টের রঙ, রেখা ও বিষয়বস্তু ঢাকার দৃশ্যমান সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। এ শিল্প শুধু রিকশাকে আকর্ষণীয় করে না, বরং নগরের নিজস্ব নান্দনিক পরিচয়ও তৈরি করে।
মুক্তিযুদ্ধ ও রিকশার ভূমিকা
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও রিকশা ঢাকার মানুষের চলাচল ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও রিকশাচালকেরা মানুষ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পরিবহনে ভূমিকা রাখেন।
স্বাধীনতার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশ ও শহর পুনর্গঠনের সময়ও রিকশা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকে। শহরের বিস্তার ও মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রিকশার সংখ্যাও বাড়তে থাকে।
নগরজীবনে রিকশার প্রয়োজন
ঢাকার গণপরিবহনব্যবস্থা নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। বড় সড়কে বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল করলেও বাড়ির গলি, বাজারের ভেতর কিংবা স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় রিকশার বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন।
রিকশা যাত্রীকে নির্দিষ্ট গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছে দিতে পারে। অনেক সময় যানজট এড়িয়ে সরু পথ ধরে চলতে পারে। ফলে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী, বয়স্ক ব্যক্তি ও বাজারের ক্রেতাদের কাছে রিকশা এখনো প্রয়োজনীয় বাহন।
তবে রিকশা নিয়ে নগরে বিতর্কও রয়েছে। যানজট, সড়ক ব্যবস্থাপনা, চালকদের শ্রমপরিবেশ ও যাত্রীভাড়া নিয়ে নানা আলোচনা হয়। রিকশাচালকদের নিরাপত্তা, ন্যায্য আয় এবং সুশৃঙ্খল চলাচল নিশ্চিত করাও নগর ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ঢাকার পরিচয়ের অংশ
সময় বদলেছে, ঢাকার রাস্তায় এসেছে বাস, মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ি। তবু রিকশা হারিয়ে যায়নি। বরং এটি ঢাকার নগরপরিচয়ের একটি স্বতন্ত্র প্রতীক হয়ে উঠেছে।
দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছেও ঢাকার রিকশা আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে। রঙিন রিকশা, ব্যস্ত রাস্তা, চালকের প্যাডেল আর শহরের পুরোনো গলি—সব মিলিয়ে এটি ঢাকার জীবন্ত চিত্র তুলে ধরে।
রিকশা শুধু একটি বাহন নয়; এটি শ্রমজীবী মানুষের জীবন, নগরের অর্থনীতি, লোকজ শিল্প এবং শহরের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক চলমান ইতিহাস। ঢাকার পথ যতই বদলাক, রিকশার ঘণ্টির শব্দে এই শহরের পুরোনো গল্পগুলো হয়তো আরও বহুদিন বেঁচে থাকবে।
ঢাকা এক্সপ্রেস/এসআই