শিরোনাম
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৪:৩০, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস
পুরান ঢাকা মানেই সরু গলি, পুরোনো দালান, ব্যস্ত মানুষের ছুটে চলা আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা নানা রকম খাবারের ঘ্রাণ। এখানে ইতিহাস শুধু পুরোনো ভবনের দেয়ালে আটকে নেই। ইতিহাস মিশে আছে খাবারের স্বাদেও। শত বছরের ঐতিহ্য বহন করে আজও টিকে আছে পুরান ঢাকার খাবারের সংস্কৃতি।
সকাল থেকে রাত—পুরান ঢাকার অলিগলিতে খাবারের ব্যস্ততা যেন থামতেই চায় না। কোনো দোকানে ভাজা হচ্ছে কাবাব, কোথাও হাঁড়িতে ফুটছে বিরিয়ানি। আবার কোনো গলিতে ছড়িয়ে পড়ছে বাকরখানি ও চায়ের সুবাস। খাবারের এই বৈচিত্র্যই পুরান ঢাকাকে অন্য যেকোনো এলাকার চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।
বিরিয়ানির ঘ্রাণে পুরান ঢাকা
পুরান ঢাকার খাবারের কথা উঠলেই সবার আগে আসে বিরিয়ানি। বিশেষ করে কাচ্চি বিরিয়ানি এখানকার খাবার সংস্কৃতির অন্যতম পরিচিত অংশ। মাংস, চাল, আলু ও নানা মসলার সমন্বয়ে তৈরি এই খাবারের স্বাদ নিতে প্রতিদিনই বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ ছুটে আসেন পুরান ঢাকায়।
পুরান ঢাকার বিরিয়ানির বিশেষত্ব শুধু স্বাদে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের রন্ধন ঐতিহ্য। মাটির চুলা, বড় হাঁড়ি আর নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে রান্নার কারণে এখানকার বিরিয়ানিতে আলাদা এক ঘ্রাণ তৈরি হয়।
তবে বিরিয়ানি মানেই শুধু কাচ্চি নয়। পুরান ঢাকার খাবারের তালিকায় রয়েছে নানা ধরনের মাংসের পদ, পোলাও ও ভুনা। উৎসব কিংবা পারিবারিক আয়োজনেও এসব খাবারের কদর রয়েছে।
কাবাবের ধোঁয়া আর মসলার ঘ্রাণ
পুরান ঢাকার অলিগলিতে হাঁটলে চোখে পড়বে কাবাবের দোকান। কয়লার আগুনে মাংস পোড়ার দৃশ্য আর ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে থাকা মসলার ঘ্রাণ পথচারীদের থামিয়ে দেয়।
শিক কাবাব, বটি কাবাব, টিক্কা কিংবা নানা ধরনের গ্রিল—খাবারপ্রেমীদের জন্য পুরান ঢাকা যেন এক বিশাল খোলা রান্নাঘর।
এখানকার কাবাবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মসলার ব্যবহার। মাংস মেরিনেট করার পর কয়লার আঁচে ধীরে ধীরে রান্না করা হয়। ফলে বাইরে হালকা পোড়া স্বাদ আর ভেতরে নরম মাংস—দুইয়ের সমন্বয়ে তৈরি হয় ভিন্ন স্বাদ।
বাকরখানি থেকে চা
পুরান ঢাকার সকালের খাবারের কথাও আলাদা করে বলতে হয়। বাকরখানি এখানকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের তালিকায় অন্যতম। স্তরে স্তরে তৈরি এই রুটি চা কিংবা অন্যান্য খাবারের সঙ্গে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।
সকালের ব্যস্ততায় দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে এক কাপ চায়ের সঙ্গে বাকরখানি খাওয়ার দৃশ্য পুরান ঢাকার দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ।
শুধু খাবার নয়, এসব খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের স্মৃতি। অনেক পরিবারের কাছে প্রিয় খাবারের দোকান কিংবা নির্দিষ্ট কোনো পদ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পরিচিত হয়ে এসেছে।
উৎসবের খাবারে আলাদা আয়োজন
রমজান এলে পুরান ঢাকার খাবারের জগৎ যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ইফতারের সময় বিভিন্ন খাবারের দোকান ও বাজারে মানুষের ভিড় বাড়ে।
ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, কাবাব, হালিম, জিলাপি—নানা ধরনের খাবারে সাজে ইফতারের আয়োজন। তবে পুরান ঢাকার ইফতারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বৈচিত্র্য।
একই সঙ্গে অনেক ধরনের খাবারের সমাহার মানুষকে আকৃষ্ট করে। রমজানের সন্ধ্যায় খাবারের দোকানগুলোর সামনে মানুষের ভিড় পুরান ঢাকার চেনা দৃশ্য।
খাবারের ভেতরেই সংস্কৃতির গল্প
পুরান ঢাকার খাবারকে শুধু ক্ষুধা মেটানোর উপকরণ হিসেবে দেখলে এর বড় একটি দিক বাদ পড়ে যায়। এসব খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস।
বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের ফলে পুরান ঢাকার খাবারে এসেছে বৈচিত্র্য। রান্নার পদ্ধতি, মসলার ব্যবহার ও খাবারের পরিবেশনেও সেই প্রভাব দেখা যায়।
এ কারণেই পুরান ঢাকার খাবার শুধু স্থানীয় মানুষের কাছে জনপ্রিয় নয়। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে এখানকার পুরোনো স্বাদ খুঁজতে।
বদলেছে সময়, টিকে আছে স্বাদ
সময় বদলেছে। পুরান ঢাকার অনেক পুরোনো স্থাপনা হারিয়ে গেছে। বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপনও। আধুনিক রেস্টুরেন্ট ও ফাস্টফুডের ভিড়ও বেড়েছে।
তারপরও পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের আবেদন কমেনি। পুরোনো দোকানগুলোর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তারাও ঐতিহ্যবাহী খাবারকে নতুনভাবে উপস্থাপন করছেন।
খাবারের স্বাদ বদলালেও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগ বদলায়নি। একজন পুরান ঢাকাবাসীর কাছে কোনো খাবার হয়তো শৈশবের স্মৃতি। আবার বাইরের কারও কাছে সেটিই পুরান ঢাকাকে চেনার প্রথম অভিজ্ঞতা।
এক কামড়ে এক টুকরো ইতিহাস
পুরান ঢাকার খাবার আসলে একটি জীবন্ত ঐতিহ্য। এখানে প্রতিটি খাবারের সঙ্গে মিশে আছে মানুষের গল্প, পারিবারিক স্মৃতি, ব্যবসায়ীদের প্রজন্মের পর প্রজন্মের অভিজ্ঞতা এবং একটি শহরের পরিবর্তনের ইতিহাস।
তাই পুরান ঢাকায় খাবার খাওয়া মানে শুধু পেট ভরানো নয়। সরু গলির ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কোনো পুরোনো খাবারের দোকানে বসে এক প্লেট বিরিয়ানি কিংবা কয়েকটি কাবাব খাওয়া মানে যেন শহরের অতীতকে একটু ছুঁয়ে দেখা।
পুরান ঢাকা তাই শুধু একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়। এটি ঢাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্বাদের এক জীবন্ত ঠিকানা। সময়ের স্রোতে শহর যতই বদলাক, খাবারের ঘ্রাণে পুরান ঢাকার সেই পুরোনো গল্পগুলো হয়তো এভাবেই বেঁচে থাকবে।
ঢাকা এক্সপ্রেস/এসআই