শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫:৫৫, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় ভূমিকম্প হলে ভবন, সড়ক ও অবকাঠামোর পাশাপাশি বড় বাঁধ ও জলাধার নিয়েও তৈরি হতে পারে নতুন উদ্বেগ।
বিশেষ করে কাপ্তাই বাঁধ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে বাঁধটি কতটা নিরাপদ থাকবে? রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে অবস্থিত এই বাঁধের সঙ্গে দেশের সবচেয়ে বড় কৃত্রিম জলাধার কাপ্তাই লেকের বিপুল পরিমাণ পানি জড়িত। তাই বড় ধরনের ভূমিকম্পে বাঁধের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিতে পারে।
শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে বাঁধের বিভিন্ন অংশে ফাটল, কাঠামোগত দুর্বলতা কিংবা অন্যান্য ক্ষতি তৈরি হতে পারে। তবে ভূমিকম্প হলেই বাঁধ ভেঙে যাবে এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বাঁধের নিরাপত্তা নির্ভর করে এর নকশা, নির্মাণমান, বর্তমান কাঠামোগত অবস্থা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং নির্দিষ্ট মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করার সক্ষমতার ওপর। কোনো দুর্বল অংশ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হলে এবং সেখান থেকে পানি বের হওয়ার পথ তৈরি হলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে প্রবাহিত হতে পারে। এতে বাঁধের নিচের দিকে থাকা জনবসতি ও অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বর্ষাকালে কাপ্তাই লেকে পানির পরিমাণ সাধারণত বেশি থাকে। ফলে একই সময়ে যদি শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটে এবং বাঁধের কাঠামো কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সম্ভাব্য ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তবে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হবে, তা নির্ভর করবে ভূমিকম্পের মাত্রা, উৎপত্তিস্থল, বাঁধের ওপর এর প্রভাব, লেকের পানির স্তর এবং বাঁধের ক্ষতির ধরনসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধ ১৯৬২ সালে চালু হয়। অর্থাৎ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামোর অংশ হিসেবে কাজ করছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহৃত একটি বড় বাঁধের ক্ষেত্রে নিয়মিত কাঠামোগত পরীক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে বাঁধের বিভিন্ন অংশের বর্তমান অবস্থা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কোথাও ফাটল, ক্ষয় বা কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি হয়েছে কি না, পানির চাপ কীভাবে কাজ করছে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা কতটা এসব বিষয় নিয়মিত পর্যালোচনা করা জরুরি।
কাপ্তাই বাঁধের বড় ধরনের ক্ষতি হলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হবে বিপুল জলরাশির আকস্মিক প্রবাহ। বাঁধের কোনো অংশ বড় আকারে ভেঙে গেলে পানি দ্রুত নিচের দিকে নেমে যেতে পারে। এতে কাপ্তাই ও আশপাশের নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের জীবন, ঘরবাড়ি, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তবে কাপ্তাই বাঁধ ভেঙে গেলে ঠিক কোন কোন এলাকা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক মডেলিং ছাড়া নির্দিষ্ট করে বলা ঠিক নয়।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে কাপ্তাই বাঁধ যেকোনো সময় ভেঙে পড়বে। বরং ঝুঁকির বিষয়টি সামনে রেখে আগাম প্রস্তুতি নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। কাপ্তাই বাঁধের কাঠামোগত সক্ষমতা নিয়মিত পরীক্ষা, ভূমিকম্প সহনশীলতা মূল্যায়ন, জরুরি সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির মানচিত্র তৈরি করা গেলে বড় দুর্যোগের সময় ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। ভূমিকম্প কখন হবে তা আগে থেকে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। কাপ্তাই বাঁধের নিরাপত্তা তাই শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয় নয় এটি লাখো মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।
ঢাকা এক্সপ্রেস/ ই