শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২:৫৮, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার একসময় যেখানে আগুনের চুল্লি, হাতুড়ির শব্দ আর কারিগরদের নিপুণ হাতে গড়ে উঠত বাংলার ঐতিহ্যবাহী সোনার গয়না। সেই তাঁতীবাজার এখনো আছে, আছে হাজারো সোনার দোকানও। কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে সেই গয়না তৈরির কারিগররা।
পুরান ঢাকার সরু গলি পেরিয়ে তাঁতীবাজারে ঢুকলেই চোখে পড়ে সারি সারি স্বর্ণের দোকান। ঝলমলে শোরুম, কাচের ভেতর সাজানো গয়না, ক্রেতাদের আনাগোনা—সব মিলিয়ে বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, স্বর্ণের ব্যবসা এখানে বেশ জমজমাট। কিন্তু এই ঝলমলে দৃশ্যের আড়ালে রয়েছে অন্য এক গল্প। সেটি হলো হাতে হাতে গয়না তৈরির এক পুরোনো শিল্প ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার গল্প।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির তথ্য অনুযায়ী, একসময় শুধু ঢাকাতেই প্রায় ১৫ হাজার স্বর্ণকার কাজ করতেন। কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজারে। অর্থাৎ হাজার হাজার কারিগর ইতোমধ্যে এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে গেছেন। কেউ মুদি দোকান দিয়েছেন, কেউ কাপড়ের দোকানে কাজ করছেন, কেউ আবার পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে। অথচ এই কারিগরদের হাতেই তৈরি হতো এমন সব নকশা, যার অনেকগুলোর নাম এখন নতুন প্রজন্মের কাছেই অপরিচিত সীতাহার, মানতাশা, ময়ূরপঙ্খী বালা কিংবা ঐতিহ্যবাহী জড়োয়া গয়না।
তাঁতীবাজারের ঐতিহ্যবাহী স্বর্ণশিল্প কখনোই একজন মানুষের কাজ ছিল না। প্রথমে সোনা গলিয়ে কাঠামো তৈরি করতেন গড়িত কারিগর। এরপর সেই গয়না যেত নকশার কারিগরের কাছে। তারপর ছিলা, ঘষা, পালিশ, মিনা, পাথর বসানোসহ একাধিক ধাপ পেরিয়ে তৈরি হতো একটি পূর্ণাঙ্গ অলংকার। অর্থাৎ একটি গয়নার পেছনে জড়িয়ে থাকত একাধিক মানুষের দক্ষতা, সময় ও অভিজ্ঞতা। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি সেই ব্যবস্থাটাকেই বদলে দিয়েছে। এখন লেজার কাটিংসহ নানা আধুনিক যন্ত্র অনেক দ্রুত কাজ করতে পারে। একটি লেজার মেশিন একই সময়ে বহু কারিগরের কাজ করে দিতে পারে। ফলে হাতে কাজ জানা দক্ষ কারিগরের প্রয়োজন আগের তুলনায় কমেছে।
স্বর্ণের দাম বাড়ার প্রভাবও পড়েছে এই শিল্পে। একসময় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও নিয়মিত সোনা কিনত। বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা ভবিষ্যতের সঞ্চয় সবকিছুর সঙ্গেই স্বর্ণের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু স্বর্ণের দাম বাড়তে বাড়তে এখন অনেকের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ফলে গয়না বানানোর প্রবণতাও কমেছে। কারিগরদের ভাষায়, আগে যে কাজ নিয়মিত পাওয়া যেত, এখন সেটি পেতে অপেক্ষা করতে হয়। কাজ কমলে আয় কমে, কিন্তু কারখানা চালানোর খরচ কমে না। বিদ্যুৎ, পানি, দোকান বা কারখানার অন্যান্য খরচ ঠিকই দিতে হয়।
তাঁতীবাজারের সবচেয়ে বড় সংকট শুধু কাজ কমে যাওয়া নয় নতুন প্রজন্মের এই পেশায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলা। একজন দক্ষ স্বর্ণকার হতে বছরের পর বছর একজন ওস্তাদের কাছে কাজ শিখতে হয়। ছোটবেলা থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে হাত পাকাতে হয়। এই দীর্ঘ প্রশিক্ষণের বিপরীতে বর্তমান সময়ে নিশ্চিত আয় বা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা কতটা সেটিও বড় প্রশ্ন। ফলে অনেক তরুণ এই পেশায় আসতে চাইছেন না। আর যারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন, তাদের অনেকেই বয়সের ভারে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছেন। ফলে একজন কারিগরের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে তার বহু বছরের অভিজ্ঞতা, নকশা বোঝার ক্ষমতা এবং হাতে কাজ করার কৌশল।
তাঁতীবাজারে বর্তমানে স্বর্ণের দোকানের সংখ্যা বরং অনেক বেড়েছে। ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে সেখানে আড়াই হাজারের বেশি স্বর্ণের দোকানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু দোকান বাড়লেই যে কারিগর বাড়ছে, বাস্তবতা তা নয়। কারণ দোকানে কাজ করেন বিক্রয়কর্মী ও ব্যবসায়ীরা, আর গয়না তৈরির কাজ হয় আলাদা কারখানায়। এই বৈপরীত্যই দেখিয়ে দেয় তাঁতীবাজারের স্বর্ণের ব্যবসা হয়তো টিকে আছে, কিন্তু তার পুরোনো হাতের কারুকাজের শিল্পটি সংকুচিত হচ্ছে।
তাঁতীবাজারের গলিতে এখনো কোথাও কোথাও শোনা যায় হাতুড়ির টুংটাং শব্দ। ছোট্ট কারখানায় বসে কোনো বৃদ্ধ কারিগর হয়তো এখনো সূক্ষ্মভাবে সোনার একটি টুকরোয় নকশা ফুটিয়ে তুলছেন। তার হাত থেমে গেলে সেই নকশাটিও হয়তো থেমে যাবে। কারণ মেশিন নতুন নকশা তৈরি করতে পারে, দ্রুত কাজ করতে পারে, কিন্তু একজন পুরোনো কারিগরের হাতের অভিজ্ঞতা, চোখের মাপ আর বছরের পর বছর ধরে শেখা নিখুঁত কারুকাজ সেটি কোনো যন্ত্র সহজে তৈরি করতে পারে না। তাঁতীবাজার তাই শুধু স্বর্ণের বাজার নয়। এটি ঢাকার একটি জীবন্ত ঐতিহ্য। কিন্তু সেই ঐতিহ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষগুলো সোনার কারিগররা যদি একে একে পেশা ছেড়ে দেন, তাহলে একদিন হয়তো তাঁতীবাজারে হাজারো গয়নার দোকান থাকবে, থাকবে ঝলমলে শোরুমও; শুধু থাকবে না সেই মানুষগুলো, যাদের হাত ধরে এই বাজারের পরিচয় তৈরি হয়েছিল। প্রশ্ন তাই একটাই তাঁতীবাজারের স্বর্ণের ব্যবসা কি টিকে থাকবে, নাকি একদিন শুধু ইতিহাসের পাতাতেই খুঁজতে হবে ঢাকার সেই সোনার কারিগরদের?
ঢাকা এক্সপ্রেস/ ই