ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

২৯ আশ্বিন ১৪৩৩, ০২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

ইস্তাম্বুলের গ্র্যান্ড বাজার: ৫০০ বছরের ঐতিহ্য ও কারুশিল্পের গল্প

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৮:২২, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

ইস্তাম্বুলের গ্র্যান্ড বাজার: ৫০০ বছরের ঐতিহ্য ও কারুশিল্পের গল্প

ছবি : সংগৃহীত

তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অবস্থিত ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজার বিশ্বের প্রাচীনতম ও বৃহত্তম আচ্ছাদিত বাজারগুলোর একটি। প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে এই বাজার শুধু বাণিজ্যের কেন্দ্র নয়, বরং কারুশিল্প, পারস্পরিক আস্থা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে দক্ষতা হস্তান্তরের ঐতিহ্যও বহন করে চলেছে।

বাজারটির প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু ঝলমলে দোকান কিংবা পর্যটকদের ভিড়ে সীমাবদ্ধ নয়। এর সরু গলি ও পুরোনো ভবনের আড়ালে রয়েছে অসংখ্য দক্ষ কারিগরের কর্মশালা, যেখানে আজও হাতে তৈরি হচ্ছে মূল্যবান গয়না।

সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদের উদ্যোগে যাত্রা

১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপল দখলের পর উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ গ্র্যান্ড বাজার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণ এবং নিজের প্রতিষ্ঠিত স্থাপনাগুলোর অর্থায়নে বাণিজ্যকেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সময়ের সঙ্গে বাজারটি বিস্তৃত হয়েছে। ভূমিকম্পসহ নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এটি তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে বাজারটিতে রয়েছে ৬৫টি সড়ক, ১৪টি ঐতিহ্যবাহী সরাইখানা, প্রায় ৩ হাজার ৬০০ দোকান এবং ১১টি প্রধান প্রবেশপথ। প্রতিদিন এখানে সর্বোচ্চ চার লাখ দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।

বিভিন্ন সম্প্রদায়ের হাতে গড়ে ওঠা ঐতিহ্য

গ্র্যান্ড বাজারের কারুশিল্পের ইতিহাসে তুরস্কের আর্মেনীয়, গ্রিক, ইহুদি ও সিরীয় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কারিগরদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা পাশাপাশি কাজ করেছেন, ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়েছেন এবং নিজেদের দক্ষতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

বাজারের অভিজ্ঞ গয়না ব্যবসায়ী ৭৮ বছর বয়সী উমিত বের্কসয়ের কাছে এই ঐতিহ্যের মূল্য অনেক। তার মতে, বাজারটির আসল শক্তি লুকিয়ে আছে আড়ালে কাজ করা দক্ষ কারিগরদের মধ্যে। সময়ের সঙ্গে পণ্যের ধরন ও ক্রেতাদের চাহিদা বদলালেও এই কারুশিল্পের ভিত্তি টিকে রয়েছে।

বাজারের অন্যতম ঐতিহাসিক অংশ চেভাহির বেদেসতেনি। ১৫টি গম্বুজবিশিষ্ট এই স্থাপনাকে কেন্দ্র করেই বাজারটির বিস্তার ঘটে। শতাব্দীপ্রাচীন এই বাণিজ্যকেন্দ্রে মুনাফার পাশাপাশি কৌশল, অভিজ্ঞতা ও ব্যবসায়িক সম্পর্কও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

গুরু-শিষ্যের হাত ধরে এগিয়ে চলা

গ্র্যান্ড বাজারের বিভিন্ন দোকানে এখনও টিকে আছে পুরোনো ব্যবসা ও কারুশিল্পের ধারা। ১৮৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত আর্মেনীয় মালিকানাধীন ‘আপারাম’ দোকানে বিক্রি হয় কাঁচা স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতু। কাছাকাছি ‘এপোক’ নামের প্রাচীন সামগ্রীর দোকানটির ইতিহাস ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত।

৭৬ বছর বয়সী গেভার্ট তেমিনিয়ান কৈশোরে এই দোকানে সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে তিনি তার সাবেক শিক্ষানবিশ ইব্রাহিম হালিল ইয়িসারাচের সঙ্গে ব্যবসাটি পরিচালনা করছেন। অর্থনৈতিক চাপে অনেকে মূল্যবান সামগ্রী বিক্রি করতে এলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী তেমিনিয়ান।

অন্যদিকে, গয়না তৈরির কারিগর সেভান হারুনিয়ান প্রায় ৪৬ বছর ধরে এ পেশায় যুক্ত। তার কর্মশালায় উমিত বের্কসয়ের নকশা অনুযায়ী ১২ ক্যারেটের একটি চুনি স্বর্ণের আংটিতে বসানোর কাজ চলছে।

সেভানের দুই ছেলে আরদা ও আরাসও ছোটবেলা থেকে বাবার কাছে কাজ শিখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিষয়ে পড়াশোনা করা আরাস পারিবারিক ব্যবসায় কম্পিউটারভিত্তিক নকশার প্রযুক্তি যুক্ত করেছেন। তার ভাই আরদা শিখছেন হাতে-কলমে কাজ।

সেভানের বিশ্বাস, গুরু-শিষ্যভিত্তিক শিক্ষা ও পারিবারিক অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই পেশার ঐতিহ্য ধরে রাখার অন্যতম উপায়।

আধুনিকতার ভিড়েও হাতে তৈরি গয়নার কদর

গ্র্যান্ড বাজারের অন্যতম প্রধান ব্যবসা গয়না। ২০১৭ সালের এক গবেষণায় বাজারটিতে ৫৩২টি গয়নার দোকান ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করা হয়। এসব ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে দক্ষ কারিগরদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

৬৬ বছর বয়সী হ্রান্ত জোরবাস পাথর বসানোর কাজে বিশেষজ্ঞ। বের্কসয়ের নকশা অনুযায়ী তৈরি আংটিতে চুনিটি বসানোর দায়িত্ব তার। তার ছেলে শান্ট আধুনিক মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করলেও জোরবাস এখনও নিজের চোখে পাথরের ফাটল, ত্রুটি ও সূক্ষ্ম দাগ পরীক্ষা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

জীবনযাপন ও বিলাসপণ্যের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। সেই সঙ্গে গয়নার ব্যবহারেও এসেছে পরিবর্তন। তবে হাতে তৈরি গয়নার সৌন্দর্য ও কারিগরি নিপুণতার কদর এখনও রয়েছে বলে মনে করেন শান্ট।

আংটিতে নিখুঁতভাবে বসানো চুনিটি দেখে মুগ্ধ হন বের্কসয়। তার প্রশ্ন, কারখানায় তৈরি কোনো আংটি কি হাতে তৈরি এমন গয়নার সৌন্দর্যের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে?

পাঁচ শতাব্দী ধরে টিকে থাকার রহস্য

আধুনিক বিপণিকেন্দ্র, প্রযুক্তি ও পরিবর্তিত ক্রেতাচাহিদার মধ্যেও গ্র্যান্ড বাজার তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। এর পেছনে রয়েছে দক্ষ কারিগরদের নিষ্ঠা, দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং প্রজন্মান্তরে জ্ঞান হস্তান্তরের ধারাবাহিকতা।

গ্র্যান্ড বাজার তাই কেবল কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের হাতে গড়ে ওঠা শিল্পের জীবন্ত নিদর্শন। সময় বদলালেও এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন সেই কারিগরেরা, যাদের নিপুণ হাতে প্রতিটি গয়না হয়ে ওঠে একেকটি স্বতন্ত্র শিল্পকর্ম।

সূত্র: CNN 

ঢাকা এক্সপ্রেস/এসআই

আরও পড়ুন