শিরোনাম
মো. আরাফাত রহমান, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:
প্রকাশ: ১৭:৩১, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস
পুরোনো ব্রহ্মপুত্র নদের শান্ত ঢেউ আর রোদে পোড়া ইট-পাথরের রাজবাড়ির গায়ে লেগে থাকা ইতিহাস, এ দুয়ে মিলেই ময়মনসিংহ। তদানিন্তন ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ এই জেলা কেবল মানচিত্রের একটি প্রশাসনিক এলাকা নয়; এটি শিক্ষা, সাহিত্য ও আবহমান সংস্কৃতির এক গভীর উর্বর ভূমি।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে, অর্থাৎ ১৭৮৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে আনুষ্ঠানিকভাবে ময়মনসিংহ জেলার গোড়াপত্তন হয়। কিন্তু এই জনপদের প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়েছিল তারও আগে, ব্রহ্মপুত্র নদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক চঞ্চলতায়। পরবর্তীতে মুক্তাগাছা, রামগোপালপুর ও গাউছপুরের জমিদারদের শিল্পানুরাগ ও দূরদর্শী পৃষ্ঠপোষকতায় ময়মনসিংহ এক আধুনিক শিক্ষানগরী ও সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নিজেকে মেলে ধরে। নদীর বুকে ভেসে আসা পণ্যবাহী তরী আর রাজকীয় প্রাসাদের কারুকাজ মিলেমিশেই এই শহরের বেড়ে ওঠার সূচনা।
আজকের ময়মনসিংহ শহরের অলিগলিতে হেঁটে বেড়ালে থমকে দাঁড়াতে হয় অতীত আর বর্তমানের সুন্দর সহাবস্থান দেখে। মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর স্মৃতি বহনকারী শশী লজ কিংবা লোহা ও কাঠের দৃষ্টিনন্দন কারুকাজে তৈরি আলেকজান্ডার ক্যাসেল আজও সেই রাজকীয় আমলের আভিজাত্য ঘোষণা করে। কাছেই ব্রহ্মপুত্রের কোল ঘেঁষে প্রসারিত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পার্ক যেন ব্যস্ত শহরের ক্লান্ত মানুষের এক চিলতে শান্তির আশ্রয়। সেখান থেকে কিছুটা দূরে শতাব্দীর প্রাচীন আনন্দমোহন কলেজ, বিশাল পরিসরের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কবি নজরুলের স্মৃতিকন্যা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় পুরো শহরজুড়ে তরুণ প্রাণের এক অফুরন্ত চঞ্চলতা ধরে রেখেছে। আর মুক্তাগাছা গেলে তো প্রাচীন প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ আর ঐতিহাসিক মন্ডার সুবাস পর্যটকদের নিমেষেই ফিরিয়ে নিয়ে যায় শতবছর পেছনের কোনো এক স্বর্ণযুগে।
এই জনপদের মাটি যেমন উর্বর, তেমনই উর্বর এখানকার মানবিক প্রজ্ঞা। বিশ্বমঞ্চে বাংলার দুঃখ-দুর্দশা আর সংগ্রামকে তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম—সবাই এই মাটিরই সন্তান। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনের অন্যতম বীর শহীদ আব্দুল জব্বারের রক্ত জড়িয়ে আছে এই জেলার স্মৃতির সাথে। সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির জগতেও ময়মনসিংহের অবদান অসামান্য। চন্দ্রকুমার দে ও ড. দীনেশচন্দ্র সেনের হাত ধরে সংগৃহীত 'ময়মনসিংহ গীতিকা'র মহুয়া-মলুয়ার লোকগাথা বিশ্বসাহিত্য দরবারে স্থান করে নিয়েছে। এমনকি বাংলা শিশুসাহিত্যের দুই স্তম্ভ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ও সুকুমার রায়, ব্যঙ্গ সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ কিংবা কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের পারিবারিক শিকড়ও প্রোথিত এই ঐতিহ্যের শহরেই।
তবে কেবল ইতিহাস আর বিখ্যাত ব্যক্তিদের নামেই ময়মনসিংহ সীমাবদ্ধ নয়; এই শহরের আসল প্রাণ স্পন্দিত হয় এর সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবন সংগ্রামে। ভোর হতেই ব্রহ্মপুত্রের ঘাটে শুরু হয় জেলে ও মাঝিদের হাঁকডাক। শহরের প্রধান সড়কগুলোতে রিকশাচালকের ঘাম ঝরানো প্যাডেল আর পাইকারি বাজারে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক নতুন দিন। চরাঞ্চলের মানুষ প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সাথে লড়াই করে ফসল ফলায়, আর শহরের মেসগুলোতে থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী আঁকতে থাকে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরির স্বপ্ন।
এই কঠোর লড়াইয়ের মধ্যেও ময়মনসিংহবাসীর অন্তরে জমা থাকে এক অপার সোহার্দ্য ও আতিথেয়তা। 'খাইবাম', 'যাইবাম'-এর মতো মিষ্টি ও স্বাতন্ত্র্যসূচক আঞ্চলিক ভাষার টানে পরম মমতায় তারা অতিথি আপ্যায়ন করে। খাবার টেবিলে ঝাল চ্যাপা শুঁটকির তরকারি আর শুভ অনুষ্ঠানে মুক্তাগাছার বিখ্যাত মন্ডা না থাকলে তাদের আতিথেয়তা যেন পূর্ণতা পায় না। শহরের এই সাংস্কৃতিক আবহকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে জেলার সীমান্তঘেঁষা ধোবাউড়া এলাকার গারো ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা। তাদের ঐতিহ্যবাহী 'ওয়ানগালা' উৎসব ও নিজস্ব জীবনধারা এই অঞ্চলের সংস্কৃতিতে যোগ করেছে ভিন্ন এক বর্ণিল মাত্রা।
প্রচলিত প্রবাদে বলা হয়, "হাওর জঙ্গল মহিষের শিং, এই তিনে ময়মনসিং"—কিন্তু আধুনিক ময়মনসিংহ সেই রূপক ছাড়িয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। শান্ত ব্রহ্মপুত্রের ধারা যেমন থামে না, তেমনই সমৃদ্ধ অতীতকে পাথেয় করে এবং কঠোর বাস্তবতাকে হাসিমুখে আলিঙ্গন করে ময়মনসিংহ ও তার মানুষ প্রতিদিন এগিয়ে চলেছে এক নতুন ভোরের দিকে।
ঢাকা এক্সপ্রেস/এসআই