শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯:২৬, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফাইল ছবি
ঢাকা শুধু বাংলাদেশের রাজধানী নয়, এটি ইতিহাসেরও এক জীবন্ত শহর। পুরান ঢাকার সরু গলি, পুরোনো ভবন আর ব্যস্ত বাজারের ভিড়ের মাঝেও ছড়িয়ে আছে কয়েক শতকের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ঢাকার মসজিদগুলো।
মুঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীন বাংলাদেশ—সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে ঢাকার মসজিদগুলোও হয়ে উঠেছে নগরজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধর্মীয় উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি এসব মসজিদ শহরের স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনেরও সাক্ষ্য বহন করছে।
মুঘল আমলে ঢাকায় মসজিদের বিস্তার
সপ্তদশ শতকে ঢাকা যখন মুঘল বাংলার গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তখন শহরের পরিধিও বাড়তে থাকে। প্রশাসনিক স্থাপনার পাশাপাশি গড়ে উঠতে থাকে মসজিদ, বাজার, সরাইখানা ও আবাসিক এলাকা।
এই সময়ের মসজিদগুলোর স্থাপত্যে মুঘল প্রভাব স্পষ্ট। গম্বুজ, খিলান, মোটা দেয়াল, পোড়ামাটির অলংকরণ এবং মিনারের ব্যবহার এসব স্থাপনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আজও সেই সময়ের মসজিদের নিদর্শন পাওয়া যায়। এসব স্থাপনা শুধু নামাজের স্থান নয়; এগুলো তৎকালীন নগরায়ণ ও মানুষের জীবনযাত্রারও গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
সাত গম্বুজ মসজিদ
ঢাকার ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর মধ্যে সাত গম্বুজ মসজিদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মোহাম্মদপুর এলাকায় অবস্থিত এই মসজিদটি মুঘল আমলের স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম পরিচিত নিদর্শন।
নামের মতোই মসজিদটির ছাদে রয়েছে সাতটি গম্বুজ। এর স্থাপত্যে মুঘল আমলের বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও মসজিদটি ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপত্যের স্মারক হিসেবে টিকে আছে।
হোসেনি দালান ও শিয়া সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য
পুরান ঢাকার আরেক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা হোসেনি দালান। এটি মূলত শিয়া মুসলিমদের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনা। মহররমের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে এই স্থানের সম্পর্ক রয়েছে।
ঢাকার ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্য বুঝতে হোসেনি দালানের ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ। পুরান ঢাকার বহুমাত্রিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশেরও একটি প্রতিচ্ছবি এটি।
তারা মসজিদের নান্দনিকতা
পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় অবস্থিত তারা মসজিদ স্থাপত্য ও অলংকরণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। মসজিদের অভ্যন্তরে নীল রঙের টাইলসের ব্যবহার এবং তারার নকশা থেকেই এর নামের সঙ্গে ‘তারা’ শব্দটির সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
সময় গড়ানোর সঙ্গে মসজিদটির সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন হয়েছে। ফলে এর মূল ঐতিহ্যের সঙ্গে পরবর্তী সময়ের নান্দনিকতারও সমন্বয় দেখা যায়।
চকবাজার শাহী মসজিদ
পুরান ঢাকার চকবাজারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নগরীর দীর্ঘ বাণিজ্যিক ও সামাজিক ইতিহাস। এই এলাকার শাহী মসজিদও ঢাকার পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর একটি।
চকবাজারকে কেন্দ্র করে যখন পুরান ঢাকার বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হচ্ছিল, তখন মসজিদটি স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আজও ব্যস্ত নগরজীবনের মধ্যে মসজিদটি পুরোনো ঢাকার ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।
মসজিদ শুধু উপাসনালয় নয়
ঢাকার পুরোনো মসজিদগুলোর ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, এগুলো কেবল নামাজ আদায়ের স্থান ছিল না। অনেক মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পাড়া-মহল্লার সামাজিক জীবন।
মসজিদে মানুষ নামাজ পড়েছেন, ধর্মীয় শিক্ষা নিয়েছেন, বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে পরামর্শ করেছেন। রমজান, ঈদ, মহররমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনও এসব স্থাপনাকে ঘিরে মানুষের মধ্যে সামাজিক বন্ধন তৈরি করেছে।
বদলে যাওয়া শহরে পুরোনো মসজিদ
সময়ের সঙ্গে ঢাকা বদলেছে। সরু রাস্তার জায়গায় এসেছে প্রশস্ত সড়ক, পুরোনো বাড়ির পাশে উঠেছে বহুতল ভবন। বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপনও।
তবে এই পরিবর্তনের মধ্যেও পুরোনো মসজিদগুলো দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। তাদের দেয়াল, গম্বুজ, খিলান ও অলংকরণে লুকিয়ে আছে ঢাকার অতীতের গল্প।
শহরের আধুনিকায়নের পাশাপাশি এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ করাও জরুরি। কারণ একটি শহরের পরিচয় শুধু তার নতুন ভবন বা সড়কে তৈরি হয় না; পুরোনো স্থাপনাগুলোও সেই পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ঢাকার মসজিদগুলো তাই শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়—এগুলো শহরের ইতিহাস, স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জীবন্ত স্মারক। কয়েক শতকের পথ পেরিয়ে আজও এসব মসজিদ প্রমাণ করে, সময় বদলালেও ইতিহাস তার নিজস্ব চিহ্ন রেখে যায়।
ঢাকা এক্সপ্রেস/এসআই