ঢাকা, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

১ কার্তিক ১৪৩৩, ০৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

কাজিনকে বিয়ে করলে সন্তানের জিনগত রোগের ঝুঁকি কতটা?

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ১১:৪১, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

কাজিনকে বিয়ে করলে সন্তানের জিনগত রোগের ঝুঁকি কতটা?

ছবি: সংগৃহীত

রানি ভিক্টোরিয়া, চার্লস ডারউইন কিংবা অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, এ তিন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের মধ্যে একটি মিল ছিল। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের প্রথম কাজিন অর্থাৎ চাচাতো, মামাতো, ফুফাতো বা খালাতো ভাইবোনকে বিয়ে করেছিলেন।

এ থেকেই প্রশ্ন উঠতে পারে, বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে গভীর জ্ঞান থাকা ডারউইনের মতো বিজ্ঞানীরাও কি আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের জিনগত ঝুঁকি সম্পর্কে জানতেন না? কারণ, কাছের আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ে হলে ক্ষতিকর জিন সন্তানের শরীরে সঞ্চারিত হয়ে বিভিন্ন জিনগত রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশেই প্রথম কাজিনদের মধ্যে বিয়ে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। তবে পশ্চিমা ইতিহাসের দীর্ঘ সময় ধরে মানুষ আশপাশের পরিচিতদের মধ্যেই জীবনসঙ্গী খুঁজতেন। ফলে একই পরিবার বা বংশের মধ্যে বিয়ের ঘটনা প্রায়ই ঘটত।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৬৫০ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে বিবাহিত দম্পতিদের একটি বড় অংশ ছিলেন চতুর্থ কাজিন। অর্থাৎ, তাদের সাধারণ পূর্বপুরুষ ছিলেন ১৪ পুরুষ আগের কেউ। জিনগত হিসাবে তারা মাত্র শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ ডিএনএ ভাগাভাগি করতেন।

এর তুলনায় প্রথম কাজিনদের মধ্যে জিনগত মিল ১২ দশমিক ৫ শতাংশ, দ্বিতীয় কাজিনদের মধ্যে ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং তৃতীয় কাজিনদের মধ্যে শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ। সাধারণভাবে, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মধ্যে জিনগত মিল যত বেশি হয়, সন্তানের মধ্যে সিস্টিক ফাইব্রোসিস বা সিকল-সেল অ্যানিমিয়ার মতো কিছু বংশগত রোগের ঝুঁকিও তত বাড়তে পারে।

বাবা-মা সুস্থ হলেও ঝুঁকি থাকে

এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সন্তানের মধ্যে জিনগত রোগ সঞ্চারিত হওয়ার জন্য বাবা-মায়ের নিজেদের সেই রোগে আক্রান্ত হওয়া জরুরি নয়।

উদাহরণ হিসেবে সিস্টিক ফাইব্রোসিসের কথা বলা যায়। সিএফটিআর জিনের ত্রুটির কারণে এই রোগ হয়। রোগটি প্রকাশ পাওয়ার জন্য সন্তানের শরীরে ত্রুটিপূর্ণ জিনের দুটি অনুলিপি থাকতে হয়। বাবা বা মায়ের শরীরে যদি একটি ত্রুটিপূর্ণ অনুলিপি থাকে, তবে তিনি নিজে সুস্থ থাকতে পারেন। এ ধরনের ব্যক্তিকে জিনগত রোগের ‘বাহক’ বা ‘ক্যারিয়ার’ বলা হয়।

কোনো বাহক এমন একজনকে বিয়ে করলে, যিনি ওই ত্রুটিপূর্ণ জিনের বাহক নন, তাহলে তাদের সন্তানের ওই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। তবে বাবা-মা দুজনই যদি একই ত্রুটিপূর্ণ জিনের বাহক হন, তাহলে সন্তানের ওই জিনের দুটি অনুলিপি পাওয়ার এবং রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে ২৫ শতাংশ।

তাই কাজিনদের মধ্যে বিয়ের প্রকৃত ঝুঁকি নির্ধারণ করতে হলে দুজনই একই জিনগত রোগের বাহক কি না, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের দাদা-দাদি বা নানা-নানি একই হওয়ায় নির্দিষ্ট কিছু জিনে মিল থাকার সম্ভাবনা সাধারণ দম্পতিদের তুলনায় বেশি হতে পারে।

বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, প্রথম কাজিনদের সন্তানের জন্মগত জিনগত রোগের ঝুঁকি প্রায় ৪ থেকে ৭ শতাংশ। অন্যদিকে, সাধারণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশ।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের প্রভাব

একটি নির্দিষ্ট রোগের ক্ষেত্রে ঝুঁকির পার্থক্য সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু মানুষের বংশপরম্পরায় হাজার হাজার জিনগত রোগের ত্রুটি লুকিয়ে থাকতে পারে।

একই পরিবারের মধ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাজিনদের বিয়ে চলতে থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। কারণ, এতে একই ক্ষতিকর জিন বারবার পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। নতুন বংশগত বৈচিত্র্য যুক্ত হওয়ার সুযোগও তুলনামূলকভাবে কমে যায়।

অস্ট্রিয়ার সম্রাট প্রথম ফার্দিনান্দ এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তার বাবা-মা ছিলেন প্রথম কাজিন। জন্ম থেকেই তিনি নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগতেন বলে উল্লেখ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারণ বিবেচনায় নিয়ে রক্তের সম্পর্কের বিয়েকে পারিবারিক ঐতিহ্যে পরিণত করার আগে এর জিনগত ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।

ঢাকা এক্সপ্রেস/এসএস

আরও পড়ুন