ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

১৩ কার্তিক ১৪৩৩, ১৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

মৌলিক নাটকের সংকট দূরীকরণে ’পাণ্ডুলিপি পাঠমঞ্চ’

পুলক রাজ

প্রকাশ: ১২:৫৪, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মৌলিক নাটকের সংকট দূরীকরণে ’পাণ্ডুলিপি পাঠমঞ্চ’

ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস

মঞ্চ নাটক কেবল দৃশ্যের সমাহার নয়, এটি মূলত শব্দের বুনন, চিন্তার প্রকাশ এবং জীবনকে নতুন করে দেখার এক শৈল্পিক মাধ্যম। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরেই আমাদের থিয়েটার অঙ্গনে একটি বড় আক্ষেপ রয়েছে, মৌলিক নাটকের সংকট। বিদেশি নাটক রূপান্তর কিংবা চর্বিতর্বণ গল্পের ভিড়ে মৌলিক ও সৃজনশীল পাণ্ডুলিপির আকাল যেন কাটতেই চায় না। এই অচলায়তন ভাঙতে এবং নাট্যসাহিত্যে নতুন হাওয়া বয়ে আনতে সম্প্রতি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার হলে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘পাণ্ডুলিপি পাঠমঞ্চ রঙ্গশ্রুতি'র’ তৃতীয় আসর।

গত শুক্রবার বিকালের এই আয়োজনটি প্রমাণ করেছে যে, দর্শক এখনো মৌলিক গল্পের টানে অডিটোরিয়াম'র ছুটে আসতে প্রস্তুত। এদিনের প্রধান আকর্ষণ ছিল বরেণ্য নাট্যকার ও নির্দেশক মাসুম রেজার নতুন নাটক ‘পেন্ডুলাম’ পাঠ। যখন কোনো নাট্যকার স্বয়ং তার সৃষ্টি নিজ কণ্ঠে পাঠ করেন, তখন কেবল সংলাপের উচ্চারণই হয় না, শব্দের ভেতরকার আত্মাও জীবন্ত হয়ে ওঠে। মাসুম রেজার কণ্ঠে ‘পেন্ডুলাম’ এর সেই জীবন্ত পাঠ উপস্থিত শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল।

মঞ্চায়নের পূর্বে নাটকের পাণ্ডলিপি এভাবেই প্রকাশ্যে পাঠ করার সংস্কৃতি আমাদের নাট্যচর্চায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর উপকারিতা বহুমুখী। প্রথমত, নাটকের সংলাপের ছন্দ, গতি ও চরিত্রের মনস্তত্ত্ব শ্রোতার কান পর্যন্ত পৌঁছায় কোনো রকম দৃশ্যগত বাদ্যযন্ত্রের আড়ম্বর ছাড়াই। এর ফলে রচনার শক্তিমত্তা বা দুর্বলতা সামনে চলে আসে। দ্বিতীয়ত, পাঠ-পরবর্তী আলোচনায় বরেণ্য লেখক, অনুবাদক ও শিক্ষাবিদ আব্দুস সেলিম এবং তেজগাঁও কলেজের শিক্ষক ও অভিনেত্রী নওরীন সাজ্জাদের মতো গুণীজনদের বিশ্লেষণ নাট্যকারকে তার কাজ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেয়। চা বিরতির পর দর্শক নাট্যকারের সরাসরি প্রশ্ন-উত্তর পর্ব এই আয়োজনকে আরও বেশি গণমুখী ও প্রাণবন্ত করে তোলে।

পাণ্ডুলিপি পাঠমঞ্চের আহ্বায়ক আসাদুল ইসলাম, সদস্য সচিব এইচ এম মোতালেব এবং সঞ্চালক সামিউন জাহান দোলাসহ ঢাকার বিভিন্ন নাট্যদলের নাট্যকর্মীরা মিলে যে পর্ষদ গড়ে তুলেছেন, তা আজ এক প্রশংসনীয় আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। এর আগে নাট্যজন মামুনুর রশীদ ও নাট্যকার আনন জামানের নাটক পাঠের মধ্য দিয়ে এই মঞ্চের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ নবীন-প্রবীণ নাট্যকারদের মেলবন্ধনে পরিণত হয়েছে।

থিয়েটারের শেকড় মজবুত করতে হলে প্রয়োজন নিয়মিত নতুন পাণ্ডুলিপি সৃষ্টি এবং তার সৎ মূল্যায়ন। ‘পেন্ডুলাম’ এর এই সফল পাঠ কেবল একটি নাটকের প্রদর্শনী নয়, বরং আমাদের মৌলিক নাট্যসাহিত্যের ঝুলি সমৃদ্ধ করার এক সাহসী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ। এই ধরনের নিভৃত অথচ শক্তিশালী উদ্যোগগুলোই আগামী দিনের নাট্য আন্দোলনকে পথ দেখাবে এবং আমাদের সংস্কৃতিকে করবে আরও বেশি সমৃদ্ধ ও বেগবান।

ঢাকা এক্সপ্রেস/এসআই

আরও পড়ুন