ঢাকা, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬

১৬ আশ্বিন ১৪৩৩, ১৮ রবিউস সানি ১৪৪৮

কাঠবিড়ালি আর পাখিদের কিচিরমিচিরে পশুপ্রেমী সেন্টুর গল্প

পুলক রাজ

প্রকাশ: ১৯:৫৮, ১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৯:৫৯, ১ অক্টোবর ২০২৬

কাঠবিড়ালি আর পাখিদের কিচিরমিচিরে পশুপ্রেমী সেন্টুর গল্প

ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস

রঙিন পিচঢালা পথ, যানবাহনের হর্ন আর যান্ত্রিক ব্যস্ততার এক অদ্ভুত শহর ঢাকা। এই কংক্রিটের অরণ্যে মানবজীবনের দমবন্ধ করা দৌড়ের ভিড়ে হারিয়ে যায় কত না না-বলা গল্প। কিন্তু একটু থেমে চোখ মেললে দেখা মিলবে এমন কিছু মানুষের, যারা ইট-পাথরের এই নগরীতে মমতাজুড়ে গড়ে তোলেন এক অন্যরকম শান্তির নীড়। চারুকলার সীমানা প্রাচীরের কোলঘেঁষে তেমনি এক চিরচেনা চত্বর, যার নিস্তব্ধ কোণায় প্রতিদিন বসে প্রাণের এক অপূর্ব মেলা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার অনুষদের দেয়ালের  একপাশে পলিথিনের ছাউনি ঘেরা ছোট্ট দোকান সাজিয়ে বসেন মধ্যবয়সী মানুষটি। তার নাম মোহাম্মদ কামাল হোসেন সেন্টু। সুতি সুতোয় বোনা রঙিন ব্রেসলেট, রূপালি আংটি আর ঝুলন্ত লকেটের পসরা বসে সেখানে। সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই মানুষটির মুখে সবসময় লেপ্টে থাকে এক অমলিন হাসি, যা শহুরে ক্লান্তি নিমেষেই দূর করে দিতে পারে। তবে তার এই ছোট্ট দোকানের আকর্ষণ শুধু নান্দনিক হস্তশিল্প নয়, আসল আকর্ষণ লুকিয়ে আছে তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়।

প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে তার চারপাশে জমে ওঠে ছোট্ট এক অতিথিশালা। গাছের ডাল থেকে লাফিয়ে নামে চঞ্চল কাঠবিড়ালি, চারপাশ থেকে ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে আসে চড়ুই আর শালিকের দল। ফুটপাতের ধারের ফোঁকর থেকে উঁকি দেয় লাজুক ইঁদুরও। সামান্য কিছু খাবার আর স্নেহের ডাকে তারা ছুটে আসে বিশ্বস্ত ঠিকানায়। সেন্টুর কণ্ঠে ঝরে পড়ে এক গভীর সত্য, জীবিকা নির্বাহের তাগিদে ব্যবসা করলেও পাখি কিংবা কাঠবিড়ালিদের খাওয়ানোর আনন্দটা শুধুই তার নিজের মনের শান্তির জন্য।

তার এই জীবনযাত্রা কিন্তু ফুলের বিছানা ছিল না। হাজারীবাগের বিষাক্ত ট্যানারির ধোঁয়া থেকে শুরু করে সায়েন্স ল্যাব মোড়ে খেলনা বিক্রি, কিংবা কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ঘুঙুর ফেরি করার দিনগুলো ছিল বড্ড কঠিন। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে জীবনযুদ্ধের প্রতিটি বাঁকে হোঁচট খেয়েছেন তিনি। কিন্তু শত কষ্টের মাঝেও তার ভেতরের কোমল মানুষটি হারিয়ে যায়নি। বিগত এক যুগ ধরে চারুকলার সামনের এই ফুটপাতই তার স্থায়ী ঠিকানা। জীবনের জমাট বাঁধা হতাশাগুলোকে তিনি জমতে দেননি হৃদয়ে; বরং সেগুলোকে রূপ দিয়েছেন পাখিদের প্রতি মমতায়।

পথচারীরা ক্ষণিকের জন্য থামেন, কেউ ছবি তোলেন, কেউবা কৌতূহলী হয়ে কথা বলেন। কিন্তু সেন্টুর কোনো প্রচারের লোভ নেই। বোবা প্রাণগুলোর নিঃশব্দ কৃতজ্ঞতাই তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। কোনো বড় স্বীকৃতি বা পদক ছাড়াই এই সাধারণ মানুষটি নীরবে শিখিয়ে যাচ্ছেন মানবতার আসল পাঠ। যান্ত্রিক শহরের ভিড়ে সেন্টু যেন এক টুকরো বিশুদ্ধ আকাশ, যেখানে ভালোবাসার কোনো শেষ নেই।

ঢাকা এক্সপ্রেস/এসআই

আরও পড়ুন