শিরোনাম
পুলক রাজ
প্রকাশ: ১২:৪৮, ২ নভেম্বর ২০২৬
ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস
ঢাকা মানেই এক অদ্ভুত শহর। একদিকে গতির চকচকে আলো, অন্যদিকে গলিপথগুলোর আড়ালে জমাট বাঁধা অজস্র মানুষের হাঁসফাঁস করা জীবন। ইরানি নির্মাতা মুর্তজা অতাশ জমজম এবং বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ‘ফেরেশতে’ কেবল কোনো চলচ্চিত্র নয়। এটি ঢাকার ইট-পাথরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার এক জীবন্ত গল্প। পর্দা নামার পরও এর রেশ অনেকক্ষণ ধরে মনের ভেতর এক ধরনের নিস্তব্ধতা তৈরি করে রাখে।
চলচ্চিত্রটি ঢাকার রিকশাচালক আমজাদ এবং তার স্ত্রী ফেরেশতার যাপিত জীবনকে ঘিরে। নামেই যার পরিচয় 'ফেরেশতে', তার জীবনটা কোনো রূপকথার পরীমহল নয়। বরং অভাব, ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তায় মোড়ানো এক কঠিন সংগ্রাম।
সিনেমার ন্যারেটিভ কোনো অতিরিক্ত মেলোড্রামার আশ্রয় নেয় না। পরিচালক খুব ঠান্ডা মাথায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের বেঁচে থাকার লড়াইকে ফ্রেমে ধরেছেন। আমজাদ যখন প্যাডেল ঘোরান, তখন মনে হয় যেন তিনি কেবল একটি রিকশাই টানছেন না, বরং নিজের পুরো পরিবারের ভাগ্য ও ভাগ্যবিপর্যয়ের ধাক্কা বয়ে বেড়াচ্ছেন।
চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর অভিনয়শিল্পীদের নিরাভরণ ও শেকড় সংলগ্ন অভিব্যক্তি। আমজাদ চরিত্রে সুমন ফারুক এবং অন্যান্য চরিত্রে দেশের অভিনয়শিল্পীরা এতই স্বাভাবিক অভিনয় করেছেন যে, তাদের পর্দায় চরিত্র বলে মনে হয় না। মনে হয় আমাদের আশেপাশেরই চেনা কোনো মুখ। বিশেষ করে জয়া আহসান কিংবা রিকিতা নন্দিনী শিমুদের মতো শিল্পীদের উপস্থিতি পুরো দৃশ্যপটে এক আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। তাদের মুখের ক্লান্তি, চোখের ভাষা এবং না পাওয়ার বেদনা দর্শকদের খুব সহজেই নাড়া দেয়।
ইরানি সিনেমার যে নিজস্ব কাব্যিক ও বাস্তববাদী ধারা, তার একটি সুক্ষ্ম ছাপ এই সিনেমায় স্পষ্ট। ঢাকার পরিচিত অলিগলি, ট্রাফিক, কোলাহল আর ধুলোবালিকে পরিচালক ক্যামেরার ফ্রেমে এমনভাবে ধরেছেন, যা কখনো কখনো বঞ্চনার ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, আবার কখনো তাতে এক ধরনের সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যায়। বিশেষ করে শব্দসুষমা এবং নীরবতার ব্যবহার দৃশ্যগুলোকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তোলে। যেখানে সংলাপের চেয়ে চোখের ভাষা বা পারিপার্শ্বিক শব্দ বেশি কথা বলে।
'ফেরেশতে' দেখার পর মনে প্রশ্ন জাগে আমরা যারা নাগরিক সুবিধার মায়াজালে বুঁদ হয়ে থাকি, তারা কি কখনো এই মানুষগুলোর দিকে সত্যি তাকাই? আমজাদ বা ফেরেশতার মতো চরিত্রগুলো আমাদের আশপাশেই রিকশার হ্যান্ডেল ধরে, ফুটপাতে সবজি বেচে কিংবা কোনো কারখানায় ঘাম ঝরায়। তাদেরও স্বপ্ন থাকে, মানসম্মান নিয়ে বাঁচার আকুতি থাকে।
সিনেমাটি কোনো সহজ সমাধান বা আশার বাণী শুনিয়ে দর্শককে সান্ত্বনা দেয় না, বরং প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। এটি আমাদের নাগরিক উদাসীনতার আয়নায় নিজেদের চেহারাটা একবার দেখানোর চেষ্টা করে। সব মিলিয়ে, 'ফেরেশতে' কেবল একটি উপভোগ্য ছবি নয়, এটি আত্মোপলব্ধির এক গভীর জানালা, যা অনেক দিন দর্শকের স্মৃতিতে গেঁথে থাকার দাবি রাখে।
ঢাকা এক্সপ্রেস/এসএস