ঢাকা, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

৯ কার্তিক ১৪৩৩, ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

প্রবাসীর শেকড়ছেঁড়া কান্না ও নির্মম বাস্তবতা

পুলক রাজ

প্রকাশ: ১৮:১৭, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রবাসীর শেকড়ছেঁড়া কান্না ও নির্মম বাস্তবতা

ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস

পরিবার-পরিজন ছেড়ে যারা প্রবাসে পাড়ি জমান, তাদের এই যাত্রাটা সবসময় শখের বশে হয় না। এটি মূলত পেটের টানে এবং বাধ্য হয়ে নেওয়া এক কঠিন সিদ্ধান্ত। দেশের চাকরির বাজার ও কর্মসংস্থানের চরম সংকটই এই বাধ্যতামূলক প্রবাস যাত্রার প্রধান কারণ। দেশে যদি নিজ মেধার সঠিক মূল্যায়ন হতো এবং উপযুক্ত কাজের সুযোগ থাকত, তবে কেউ শখ করে আপনজনদের ছেড়ে ভিনদেশে পড়ে থাকত না। পেটের দায়ে দেশ ছাড়লেও এই মানুষগুলোর হৃদয়জুড়ে সবসময় থাকে মাতৃভূমির টান। তারা কড়া রোদে বিদেশে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন, অথচ তাদের কষ্টের কথা কজনই বা মনে রাখে?

প্রবাস জীবনের সবচেয়ে বড় নির্মমতা এবং অদৃশ্য অভিশাপ হলো দূরত্বের ব্যবধান। দীর্ঘ সময় স্বজনদের থেকে দূরে থাকার ফলে জীবনের বহু সোনালী ও মূল্যবান মুহূর্ত হারিয়ে যায়, যা চাইলেও আর কখনো ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। উৎসব-পার্বণ, আনন্দ-বেদনা কিংবা সাধারণ এক বিকেল, সবকিছুই তাদের কাটাতে হয় নিঃসঙ্গতায়।
এর চেয়েও বড় নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হন অনেক প্রবাসী।

বিদেশে বসেই মা-বাবা, ভাইবোন কিংবা জীবনসঙ্গীর মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার মতো পাহাড়সম শোক তাদের সহ্য করতে হয়। আবার এমন বহু প্রবাসী আছেন, যারা দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে জীবিকা গুটিয়ে যখন দেশে ফেরেন, তখন দেখেন অনেক আপনজন চিরতরে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। মৃত্যুর শেষ সময়ে প্রিয় মুখটি একনজর দেখতে না পাওয়ার দহন এবং শেষ যাত্রায় পাশে থাকতে না পারার অপরাধবোধ তাদের সারাজীবন কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। স্বজনদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এই নিরব কান্না আজ দেশের লাখো প্রবাসীর নিত্যদিনের কঠিন বাস্তবতা।

রেমিট্যান্সের চাকা সচল রেখে যারা দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছেন, তাদের এই গভীর মানসিক কষ্টের সঠিক মূল্যায়ন কি আদৌ হয়? রাষ্ট্র বা নীতিনির্ধারকরা প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের হিসাব কষলেও তাদের এই মানসিক বলিদানকে হিসেবে ধরেন না। এই স্থায়ী সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র এবং মোক্ষম উপায় হলো দেশের ভেতরে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। তরুণ প্রজন্মের মেধার সঠিক মূল্যায়ন, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগ এবং যোগ্যতাভিত্তিক চাকরির সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে কাউকে এমন নির্মম পরিণতি বরণ করতে হতো না।

নিজ মাটিতে, পরিবারের সান্নিধ্যে নিরাপদে ও  সম্মানের সাথে বাঁচার অধিকার সবারই প্রাপ্য। একটি স্বাবলম্বী দেশ গড়ার মাধ্যমেই কেবল এই প্রবাস নামক দীর্ঘ বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

ঢাকা এক্সপ্রেস/এসআই

আরও পড়ুন