শিরোনাম
মীর হাসিব মাহমুদ
প্রকাশ: ১৩:৪৭, ২২ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১৩:৪৮, ২২ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাত গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় যেখানে উদ্যোক্তা হওয়াকে কেবলমাত্র ব্যবসা করার আরেকটি উপায় হিসেবে দেখা হতো, সেখানে আজ এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ গঠনের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ এখন আর শুধু চাকরির বাজারের দিকে তাকিয়ে নেই; বরং তারা নতুন নতুন সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধান তৈরির স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু এই স্বপ্নকে টেকসই বাস্তবতায় রূপ দিতে হলে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেটি হলো শিল্প–অভিজ্ঞ মেন্টরশিপ।
বাংলাদেশের উদ্যোক্তা ইকোসিস্টেমে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও নীতিগত সহায়তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হলেও অভিজ্ঞ মেন্টরদের প্রয়োজনীয়তা এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। অথচ পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি সফল স্টার্টআপ হাব—সিলিকন ভ্যালি থেকে শুরু করে সিঙ্গাপুর, বেঙ্গালুরু কিংবা তেল আবিব—একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে: একজন উদ্যোক্তা কখনো একা সফল হন না। সফলতার পেছনে থাকে অভিজ্ঞ উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, করপোরেট নেতা ও শিল্প–বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের দিকনির্দেশনা।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬৪ শতাংশ মানুষ ৩৫ বছরের নিচে। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, এই জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগাতে না পারলে ভবিষ্যতে তা দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক (ESCAP)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে দুই হাজারেরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ সক্রিয় রয়েছে এবং এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। এই সংখ্যা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক, কিন্তু এর আড়ালে আরেকটি বাস্তবতাও রয়েছে—প্রতিবছর অসংখ্য উদ্যোগ শুরু হলেও তার একটি বড় অংশ প্রথম কয়েক বছরের মধ্যেই হারিয়ে যায়।
এই ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হলো অভিজ্ঞ পরামর্শের অভাব। আমাদের দেশে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ বাড়লেও উদ্যোক্তা তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনও দুর্বল। অনেক তরুণ উদ্যম, সৃজনশীলতা এবং সাহস নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন, কিন্তু বাস্তব বাজার, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ সংগ্রহ, দল পরিচালনা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা না থাকায় তারা দ্রুত সংকটে পড়েন। একটি ভালো আইডিয়া থাকলেই যে একটি সফল কোম্পানি গড়ে তোলা যায় না, এই বাস্তবতা অনেকেই বুঝতে পারেন তখন, যখন ভুলগুলো আর শুধরে নেওয়ার সুযোগ থাকে না।
স্টার্টআপ জগতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ভুল করাটা স্বাভাবিক, কিন্তু একই ভুল বারবার করা উচিত নয়। একজন অভিজ্ঞ মেন্টর ঠিক এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। তিনি শুধু পরামর্শ দেন না; বরং নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে উদ্যোক্তাকে এমন কিছু ভুল থেকে রক্ষা করেন, যেগুলোর মূল্য অনেক সময় কয়েক বছরের শ্রম কিংবা কোটি টাকার বিনিয়োগের সমান হতে পারে। একজন ভালো মেন্টর উদ্যোক্তাকে বাজার বুঝতে শেখান, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কথা বলার ভাষা শেখান, সংকটের সময় স্থির থাকতে সাহায্য করেন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তিনি একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করে দেন, যা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রায়শই পুঁজির চেয়েও মূল্যবান হয়ে ওঠে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম দীর্ঘদিন ধরেই একটি ‘আইডিয়া–কেন্দ্রিক’ সংস্কৃতির মধ্যে আটকে ছিল। আমরা অনেক সময় উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিয়েছি, কিন্তু তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞ মানুষ তৈরি করতে পারিনি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্যোক্তা শিক্ষা চালু হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। শিক্ষার্থীরা ব্যবসার তত্ত্ব শিখেছে, কিন্তু বাস্তব করপোরেট জগতের সঙ্গে তাদের পরিচয় খুব কমই ঘটেছে। শিল্প–বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, বাস্তব প্রকল্পে অংশগ্রহণ কিংবা পেশাদার মেন্টরশিপের সুযোগ এখনও খুব সীমিত।
এই সীমাবদ্ধতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বিনিয়োগ–প্রস্তুতির ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের অনেক সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ এখনও “ভ্যালুয়েশন”, “টার্ম শিট”, “ইউনিট ইকোনমিক্স” বা “ক্যাপ টেবিল”–এর মতো মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ছাড়াই বিনিয়োগের আলোচনায় বসে। ফলে অনেক সময় উদ্যোক্তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হন, আবার অনেকেই অযৌক্তিক শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হন। এর পেছনে পুঁজির অভাব যতটা দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী সঠিক মেন্টরশিপের ঘাটতি।
সরকার গত কয়েক বছরে স্টার্টআপ উন্নয়নে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন প্রকল্প, ইনকিউবেশন সেন্টার, স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেডের বিনিয়োগ কার্যক্রম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক উদ্ভাবন কর্মসূচি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু এখন সময় এসেছে আরেক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার। শুধু অর্থায়ন বা প্রশিক্ষণ নয়, প্রয়োজন একটি জাতীয় মেন্টরশিপ কাঠামো, যেখানে সফল উদ্যোক্তা, করপোরেট নির্বাহী, বিনিয়োগকারী, গবেষক এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা সরাসরি নতুন উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যুক্ত হবেন।
বিশ্বের উন্নত স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমগুলোতে ‘ফাউন্ডার্স হেল্পিং ফাউন্ডার্স’ সংস্কৃতি অত্যন্ত শক্তিশালী। একজন সফল উদ্যোক্তা তাঁর অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেন। বাংলাদেশেও এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। বিশেষ করে দেশের বাইরে কর্মরত হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রযুক্তিবিদ, গবেষক ও ব্যবসায়িক নেতাদের অভিজ্ঞতা দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বিশাল সম্পদ হতে পারে। প্রযুক্তির এই যুগে ভার্চুয়াল মেন্টরশিপ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে সেই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের স্টার্টআপদের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিল্পখাতের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে হবে। উদ্যোক্তা শিক্ষা যেন শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং শিক্ষার্থীরা যেন বাস্তব সমস্যার সমাধান তৈরি করতে শেখে, সেদিকে নজর দিতে হবে। জেলা পর্যায়ে ইনোভেশন হাব ও মেন্টরশিপ সেন্টার গড়ে তোলার মাধ্যমেও উদ্যোক্তা তৈরির প্রক্রিয়াকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ এখন একটি সম্ভাবনার সময় পার করছে। আমাদের সামনে যেমন চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি রয়েছে এক অনন্য সুযোগ। আগামী দশকে দেশের অর্থনীতি কেমন হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে আজকের তরুণ উদ্যোক্তাদের ওপর। কিন্তু তাদের হাতে শুধু স্বপ্ন তুলে দিলেই চলবে না; তাদের পাশে অভিজ্ঞ মানুষের হাতও বাড়িয়ে দিতে হবে।
কারণ, স্টার্টআপের জগতে পুঁজি গুরুত্বপূর্ণ, প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো অভিজ্ঞতা। আর সেই অভিজ্ঞতার সবচেয়ে শক্তিশালী সেতুবন্ধনের নাম—মেন্টরশিপ।
লেখক:
স্টার্টআপ বিশেষজ্ঞ, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, লিড নেশন একাডেমী (এলএনএ)
সহকারী অধ্যাপক, সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়।