শিরোনাম
মাদারীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৬:২৯, ২৫ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ১৬:৩১, ২৫ নভেম্বর ২০২৫
ছবি: সংগৃহীত
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরে চলছে দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম্য, আর তাদের বিরুদ্ধে কথা বললেই চাপ ও হুমকি আসে। তথ্য সংগ্রহে গিয়ে সাংবাদিকরাও হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
৭ কোটি টাকার প্রকল্প, বাস্তবে নেই এক-তৃতীয়াংশ কাজ
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি যাচাই করে জানা গেছে- ১% অর্থে ১৫টি ইউনিয়নে মোট বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি টাকা। একই অর্থবছরে কাবিখা কর্মসূচিতে ১৬৬.২৬৩ মেট্রিক টন চাল ও সমপরিমাণ গম বরাদ্দ দেওয়া হয়, যার বাজারমূল্য যথাক্রমে ৯৩ লাখ ৭৪ হাজার ২৩২ টাকা ও ৭৬ লাখ ৪১ হাজার ৩৩৬ টাকা। নগদ বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ৬৬ লাখ ৯৬ হাজার ৯১২ টাকা। সব মিলিয়ে মোট বরাদ্দ দাঁড়ায় ৭ কোটি ২০ লাখ ৭০ হাজার ৯৩৬.৪৫ টাকা।
কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে- এই বিপুল টাকার মাত্র এক-তৃতীয়াংশেরও কম কাজ বাস্তবে সম্পন্ন হয়েছে। বাকি অর্থ কোথায় গেল, জানতে চান স্থানীয়রা।
অভিযোগ: অতিরিক্ত টাকা না দিলে প্রকল্প মেলে না
বিভিন্ন ইউনিয়নের সদস্যরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন- ‘প্রকল্প পাওয়ার পরে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয় সচিবকে।’
অন্যদিকে সচিবরা দাবি করেন- ‘প্রকল্পের ১০% দিতে হয় অফিসের উর্ধতন কর্মকর্তাদের।’
এ কারণে প্রকল্প বরাদ্দ থেকে বিল উত্তোলন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া জুড়েই ঘুষ-দুর্নীতির ভাগবাটোয়ারা চলে বলে অভিযোগ।
ভুতুড়ে রাস্তা, দ্বৈত বরাদ্দ, বিল উত্তোলন- কাজ শূন্য
সরেজমিনে দেখা গেছে- এক জায়গায় আগেই নির্মিত ইটের রাস্তা দেখিয়েই আবার নতুন প্রকল্প বরাদ্দ। কোথাও একই রাস্তার জন্য দুই অর্থবছরে দুটি বরাদ্দ, কিন্তু কাজ নেই। আবার কোথাও এমন রাস্তায় অর্থ বরাদ্দ- যে রাস্তা বাস্তবেই নেই। এক ইউনিয়নের ঠিকানা দেখিয়ে পাশে আরেক ইউনিয়নেও বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। এমনকি শিরখাড়া ইউনিয়নে দেখা যায়, ইউপি সচিব মো. কবিরউদ্দিন হাওলাদারের স্ত্রী সাবেক ঠিকাদারের নামে প্রতিষ্ঠান খুলে তিনটি ওয়ার্ড থেকে একাধিক প্রকল্প নিয়েছেন। বিলও তুলেছেন, কিন্তু স্থানীয়রা কোনো কাজ দেখেননি।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ- শিরখাড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে একটি পারিবারিক কবরস্থানকে ‘গণকবরস্থান’ দেখিয়ে বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে ৫.৬ মেট্রিক টন চাল। স্থানীয় সিরাজুল হক মাস্টার বলেন- ‘এটি স্পষ্ট আত্মসাৎ। সরকারের কঠোর তদন্ত প্রয়োজন।’
ক্ষোভে উত্তাল গ্রামবাসী
বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষ জানান, রাস্তা–ঘাট সংস্কারের নামে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প হলেও বাস্তবে তারা কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না। ভাঙাচোরা রাস্তা, জলাবদ্ধতা- সব কিছুর ভোগান্তি আগের মতোই রয়ে গেছে।
বড় বাড্ডার বাসিন্দা আমির হোসেন বলেন- ‘রাস্তাটি এতটাই খারাপ যে একটি ভ্যান চলতেও কষ্ট হয়। কয়েক বছর আগে এক গর্ভবতী মাকে হাসপাতালে নিতে গিয়ে বাচ্চা মারা যায়। অথচ এই রাস্তায় বরাদ্দ হয়েছে দুই বছরে দুইবার।’
এক জায়গার নাম দুই ইউনিয়নে, তবু বিল উত্তোলন
১% প্রকল্প অনুযায়ী খোয়াজপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে আনু উকিলের বাড়ি থেকে মধ্যচক শেকান খানের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার জন্য বরাদ্দ ছিল ৮ লাখ ২০ হাজার টাকা। একই ঠিকানা ব্যবহার করে পাঁচখোলা ইউনিয়নে আরো ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। কিন্তু দুই জায়গায়ই কাজ হয়নি।
দুদকের অভিযান: ১১ ইউনিয়নে অনিয়মের সত্যতা
অভিযোগের পর দুদক ৩০ সেপ্টেম্বর উপজেলা পিআইও কার্যালয় ও উপজেলা প্রকৌশলীর দপ্তরে অভিযান চালায়। নথি যাচাই শেষে ১৫ ইউনিয়নের মধ্যে ১১ ইউনিয়নে ‘বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া গেছে’ বলে জানান দুদকের উপপরিচালক মো. আখতারুজ্জামান।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব সাংবাদিকদের বলেন- ‘আমার বিষয়ে যেসকল অভিযোগ আনা হয়েছে এগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন- ‘এসব বিষয়ে স্পেসিফিক বলতে হলে কাগজপত্র দেখে বলতে হবে।’
তবে ‘ঘুষ নেওয়ার’ প্রশ্নে তিনি কোনো জবাব দিতে পারেননি।
মাদারীপুর জেলা প্রশাসকের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. হাবিবুল আলম বলেন- ‘যেখানে দ্বৈতভাবে প্রকল্প দেওয়া হয়েছে তা বাতিল করে অর্থ ফেরত আনা হবে। আর যেখানে কোনো কাজ হয়নি, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ঢাকা এক্সপ্রেস/ইউকে