শিরোনাম
নেত্রকোণা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৬:১১, ২৮ নভেম্বর ২০২৫
নেত্রকোণায় গারোদের ওয়ানগালা উৎসব। ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস
অনুষ্ঠানমালার বিভিন্ন আঙ্গিকে থাকছে শুক্রবারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচালাল একাডেমির পরিচালক কবি পরাগ রিছিল উৎসবের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। শনিবারের অনুষ্ঠানমালায় থাকবে—থিমসং, রুগালা, সাসাৎ সওয়া ও থক্কা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। এতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত সাতটি দল অংশগ্রহণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গারোদের বিশ্বাস, ‘মিসি সালজং’ বা শস্য দেবতার ওপর নির্ভর করে শস্যের ভালো ফলন হয়। তাই নতুন ফল ও ফসল ভক্ষণের আগে তারা দেবতাকে তুষ্ট করে। এ উপলক্ষে আয়োজন করা হয় ওয়ানগালা উৎসব।
ওয়ানগালা গারোদের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। ‘ওয়ানা’ শব্দের অর্থ দেব-দেবীর দানের দ্রব্যসামগ্রী এবং ‘গালা’ শব্দের অর্থ উৎসর্গ করা। এটি গারোদের ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। পূজা-অর্চনার মাধ্যমে দেব-দেবীদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও নানা আবেদন-নিবেদন করা হয়। এই কারণে অনেকেই এটিকে নবান্ন ও ধন্যবাদের উৎসবও বলে থাকেন। সাধারণত: বাংলাদেশের বৃহত্তর মংমনসিংহ ও ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো সম্প্রদায় এই রীতিতে বিশ্বাস করে।
ওয়ানগালা উৎসবের নিয়ম অনুযায়ী, জুম ক্ষেতের মাঝখানের কিছু অংশের ধান কাটা হয়। ওই স্থানটিকে গারোরা আ’সিরকার স্থান বলে ডাকে। ধান ঘরে এনে প্রথমে তারা মিসি সালজং বা সূর্যদেবতার নামে মোরগ উৎসর্গ করে। এরপর নতুন ধানের চাল দিয়ে ওয়ানগালার জন্য মদ তৈরি করা হয়। অনুষ্ঠানের পর সংনি নকমা (গ্রামপ্রধান) সবাইকে ডেকে সভা করে ওয়ানগালা উৎসবের দিন নির্ধারণ করেন। উৎসবের জন্য বাজার থেকে কেনা হয় গরু, শূকর, ছাগল, মোরগ। বাড়ির লোকদের জন্য কেনা হয় নতুন পোশাক ও অলংকারাদি। উৎসবে ব্যবহারের জন্য জোগাড় করা হয় মোরগ ও ডুকুয়া পাখির পালক।
ওয়ানগালার প্রথমদিনের নাম রুগালা। এ দিনটিতে মূলত উৎসর্গের অনুষ্ঠান হয়। শস্যের জননী ও ভাণ্ডারদেবী রক্ষিমে, গৃহদেবতা, সূর্যদেবতা ও অন্যান্য দেবতার উদ্দেশ্যে নতুন ধানের ভাত, নতুন ফসলের ফলমূল, শাক-সবজি ও পশু-পাখি উৎসর্গ করা হয়। এ দিন গরু, শূকর প্রভৃতি মেরে গারোরা সবার মাঝে মাংস বিতরণ করে।
নকমা নিকটস্থ ঝরনা, খাল বা নদী থেকে দুটি কাঁকড়া ধরে এনে একটি পাত্রে রাখেন এবং মিসি সালজং বা সূর্যদেবতার উদ্দেশে উৎসর্গ ও মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে ভাণ্ডারদেবী ও খাদ্যশস্যের জননী রক্ষিমের পূজা-অর্চনা করেন। ভাণ্ডারদেবীর পর গৃহদেবতার উদ্দেশে মন্ত্র পাঠ করে মদ ও পানীয় উৎসর্গ করা হয়। দুপুরের পর শুরু হয় ওয়ানগালার মূল অনুষ্ঠান। সালজং বা সূর্যদেবতাকে উদ্দেশ্য করে মন্ত্র পাঠের পর শুরু হয় রুগালা।
রুগালার রাতে গারোরা নাচ-গান ও আমোদ-প্রমোদ করেন। প্রতিটি বাড়িতে তৈরি হয় পিঠা। যুবক-যুবতীরা খুশিমনে নেচে-গেয়ে পরম্পরায় মদ পান করায়। এ সময় তারা গান দ্বারা পরম্পরা অনুযায়ী প্রশ্ন ও উত্তরও বিনিময় করে।
শনিবারের অনুষ্ঠানমালায় নেত্রকোণার জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান উৎসবের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। বিশেষ অতিথি থাকবেন—কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফাইযুল ওয়াসীমা নাহাত, কারিতাস বাংলাদেশের পরিচালক অপূর্ব ম্রং, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট বান্দরবানের পরিচালক নু ক্রাচিং মারমা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি রাজশাহীর পরিচালক হরেন্দ্র সিং, কারিতাস মংমনসিংহের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রোজিনা রংমা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি নির্বাহী পরিষদের সদস্য সুরভী মান্দা এবং পাঁচগাঁওয়ের সংনকমা চয়ন রিছিল।
কবি পরাগ রিছিল বলেন, ‘এ উৎসবের মাধ্যমে নবীন বয়সের গারোরা জানে তাদের সৃষ্টিতত্ত্ব, দেবতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব, জীবতত্ত্ব, দর্শন, পৌরাণিক কাহিনি এবং গারোদের অতীত গৌরবময় ঐতিহ্য। এটি তাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে বংশপরম্পরায় টিকিয়ে রাখার অনন্য প্রচেষ্টা।’
ঢাকা এক্সপ্রেস/এসএইচ