শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১:১৪, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১৩:৫৭, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস
জেলা প্রশাসনের কঠোর নির্দেশনা থাকার পরও হবিগঞ্জের বাহুবলে অবৈধ বালু উত্তোলন ও পাচার বন্ধ হচ্ছে না। অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনের নাকের ডগায় দিনের আলোতে বালু লুট হলেও রাতে লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এ ধরনের কার্যক্রম মূলত বালু পাচারকারীদের সহযোগিতা করার শামিল।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি পুলিশের ‘১০০ শতাংশ দুর্বলতা’ রয়েছে বলেও স্বীকার করেন।
জানা যায়, গত শনিবার সকাল থেকে উপজেলার হরিতলায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। স্থানীয়দের প্রশ্ন, সকালে বালু কেটে পাচার করার পর রাতে অভিযান চালানো কি বালু পাচারকারীদের সহযোগিতা করা নয়?
এ ছাড়া অভিযোগ উঠেছে, বর্তমান ইউএনও বাহুবলে যোগদানের পর কতিপয় সাংবাদিকও বালু পাচারে জড়িয়ে পড়েছেন। চিহ্নিত বালু চক্রের সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের কোন কোন কর্মচারীর সখ্যতা রয়েছে, সে বিষয়েও অভিযোগ রয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও বাহুবল প্রথমে প্রশ্ন করেন, ‘ওসিকে জিজ্ঞেস করেছেন কখনো?’ জবাবে প্রতিবেদক বলেন, ওসি সাহেবের সঙ্গে অনেকবার কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন, উপজেলা প্রশাসন যখন চায়, তখনই ফোর্স দিয়ে সহযোগিতা করেন।
তখন ইউএনও বলেন, ‘আগে আইন বুঝেন, তারপর বলেন। শুধু মোবাইল কোর্টে ফোর্স দিবে, কারণ উনি দিতে বাধ্য। কিন্তু মোবাইল কোর্ট ছাড়া তাদের তো ২৪ ঘণ্টা টহল দেওয়ার কথা। টহল দেয়? টহলে কয়টা গাড়ি আটকিয়েছে এখন পর্যন্ত? একটাও না। কিন্তু বালু আইনে তো পুলিশকেও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইউএনও কি অফিসের কাজ বাদ দিয়ে ২৪ ঘণ্টা কোর্ট করে বেড়াবে? এটা পুলিশের কাজ। পুলিশকে সরকার ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু তারা সেটা করে?’
পুলিশের দুর্বলতা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি সরাসরি বলেন, ‘১০০ শতাংশ দুর্বলতা আছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনে পুলিশকে ক্ষমতা দেওয়া থাকলেও তারা ২৪ ঘণ্টা টহল দেয় না এবং একটি গাড়িও আটক করে না। ফলে বালুখেকো চক্র বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। শুধু মোবাইল কোর্টের ওপর নির্ভর না করে পুলিশ যদি নিয়মিত টহল ও গাড়ি আটক করত, তাহলে অবৈধ বালু পাচার অনেকটাই বন্ধ হতো।
এ বিষয়ে জানতে বাহুবল মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রুহুল আমিন তালুকদারের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাহুবলে অবৈধভাবে উত্তোলন করা বালুর বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন মাঝে মাঝে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে বালু জব্দ করে। পরে সেগুলো নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। তবে নিলামে বিক্রির পর সেই বালুর কাগজপত্রকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একটি চক্র পরবর্তীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, অভিযানের সময় জব্দ করা বালু নিলামে বিক্রি করার পর সেটি কোথায়, কী পরিমাণে এবং কীভাবে পরিবহন ও ব্যবহার করা হচ্ছে—এসব বিষয়ে যথাযথ তদারকি না থাকায় নিলামের কাগজ দেখিয়ে অবৈধ বালুর বৈধতা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো বালু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে উত্তোলন করা বালুর সঙ্গে নিলামে কেনা বালুর কাগজপত্র দেখিয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করছেন।
এ ছাড়া দিনের বেলায় বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন ও ট্রাক্টরযোগে পরিবহনের সময় তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান পরিচালনা না করায় প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। পরে অভিযান হলেও আগেই উত্তোলন করা বিপুল পরিমাণ বালুর বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীরা উৎসাহিত হচ্ছেন।
অপর একটি সূত্র জানায়, গত কয়েকদিন ধরে রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুচাই এলাকায় পাহাড়ি ছড়া থেকে ট্রাক্টরযোগে অবাধে বালু পাচার হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, শুধু মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও জব্দ করা বালু নিলামে বিক্রি করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বালুর উৎস, উত্তোলনের স্থান, পরিবহনের পথ, মজুতস্থল এবং নিলামে বিক্রি করা বালুর প্রকৃত ব্যবহার—প্রতিটি ধাপে নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিলামের কাগজ দেখিয়ে কেউ অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু পরিবহন বা ব্যবসা করছেন কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি।
ঢাকা এক্সপ্রেস/এসএস