শিরোনাম
ফেনী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৯:২৮, ১১ জুলাই ২০২৫
ছবি: সংগৃহীত
টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও ভারত থেকে থেকে নেমে আসা ঢলে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ফেনীর বিভিন্ন উপজেলার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অন্তত ২১টি স্থান ভেঙে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়। কবলিত এসব গ্রামের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় আছে। বন্যার্ত এসব এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ ও নেটওয়ার্ক না থাকায় সীমাহীন দুর্ভোগ নেমে এসেছে বাসিন্দাদের।
শুক্রবার (১১ জুলাই) বিকালে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ফেনী-ফুলগাজী ও ফেনী-ছাগলনাইয়া আঞ্চলিক সড়কের উপর দিয়ে ১ থেকে ২ ফুট পর্যন্ত পানির প্রবাহ দেখা গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার থেকে ভারী বর্ষণে শুক্রবার পর্যন্ত ফুলগাজী ও পরশুরামে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ২১টি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। এতে ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া, ফেনী সদর উপজেলার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বুধবার থেকে বৃষ্টি কমতে শুরু করায় আজ সকাল থেকে পরশুরামের বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতি উন্নতি হতে থাকে। তবে বন্যার পানি নিম্নাঞ্চল ফুলগাজী গড়িয়ে ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদর উপজেলায় ঢুকতে শুরু করেছে।
গতকাল রাতে নতুন করে ছাগলনাইয়া উপজেলার পাঠান নগর, রাধা নগর, ছাগলনাইয়া পৌরসভার অন্তত ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পানি সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ঢুকেছে। উপজেলার কাজিরবাগ, মোটবী, ছনুয়া, ফাজিলপুর ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত করেছে। ভেসে গেছে এসব এলাকার পুকুর ও খামারের মাছ।
ফুলগাজী দৌলতপুর এলাকার বয়োবৃদ্ধ রেজিয়া বেগম বলেন, ‘গেল বছরের বন্যার বছর না ঘুরতেই আবারো পানিতে ডুবতে হয়েছে। সব জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। এ অঞ্চলে জুলাই-আগস্ট মাসে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ভাঙন এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। সব মিলিয়ে মাঝেমধ্যে মনে হয়, এখানে জন্মগ্রহণ করে ভুল করেছি।’
উত্তর শ্রীপুর এলাকার বাসিন্দা আলী আজ্জম বলেন, ‘বাঁধের ভাঙন স্থানে তীব্র স্রোতে পানি ঢুকছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। গেল বছরের বন্যার মতো এবারো বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সমস্যা নিয়ে ভুগতে হচ্ছে। রাজনৈতিক দল বা ক্ষমতা পরিবর্তন হলেও আমাদের ভাগ্য কখনো পরিবর্তন হয় না।’
গাইনবাড়ি এলাকার বাসিন্দা পুষ্পিতা রাণী বলেন, ‘ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে গেছে। পরিবারের শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে অবর্ণনীয় কষ্ট করতে হচ্ছে। নিরাপদ পানির সংকটে আরো বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু কর্মকর্তার দায়সারা কাজের জন্য প্রতি বছর এ জনপদে ভাঙন নিয়মে পরিণত হয়েছে। আমাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য একমাত্র টেকসই বাঁধই সমাধান।’
ফেনী সদরের মোটবী ইউনিয়নের নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বুধবার রাত থেকে আমাদের ইজ্জতপুর গ্রামে পানি বাড়তে থাকে। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত সড়কের কোথায়ও কোথায়ও ৩ থেকে ৪ ফুট পর্যন্ত ডুবে গেছে। এলাকার সবগুলো পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। অনেকেই গরু-ছাগল নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছেন।’
ফেনীর আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৮ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ক্রমন্বয়ে বৃষ্টিপাত কমছে। তাই আজ শুক্রবার থেকে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী আকতার হোসেন মজুমদার বলেন, ‘মুহুরী নদীর পানি ১ দশমিক ৯৩ মিটার বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফুলগাজী এলাকার বন্যা কবলিত গ্রামগুলোতে পানির অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। পানির চাপ কমে যাওয়ায় নতুন করে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভাঙার আশঙ্কা নেই। পানি কমে গেলেই ভাঙ্গন কবলিত স্থানগুলো মেরামত করা হবে।’
ফেনী জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ফেনীতে কবলিত চারটি উপজেলার মধ্যে পরশুরামে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। ফুলগাজীতেও কিছুটা ভালোর দিকে রয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার বন্যার পানি ছাগলনাইয়ার প্রধান সড়ক গড়িয়ে বিভিন্ন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। আশা করি, শুক্রবার পর্যন্ত জেলাজুড়ে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হবে। এখন পর্যন্ত ৫০টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৪ উপজেলায় প্রায় ৭ হাজার মানুষ আশ্রিত রয়েছে। ২০ হাজারের উপরে কবলিত জনসাধারণের মাঝে খাবার সরবরাহের জন্য প্রশাসনের সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতারাও কাজ করে যাচ্ছে।’
ঢাকা এক্সপ্রেস/ইউকে