ঢাকা, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬

১৭ আশ্বিন ১৪৩৩, ১৯ রবিউস সানি ১৪৪৮

কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের পথে কী বাংলাদেশ?

সোয়েব মোহাম্মাদ

প্রকাশ: ১৫:২৮, ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ১৫:৩২, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের পথে কী বাংলাদেশ?

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ইরান-আমেরিকা যুদ্ধকে ঘিরে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন যুদ্ধ বিরতি চললেও ইরান হরমুজ প্রণালী প্রায় অবরোধ করে রেখেছে। তাই বিশ্ব বাজারে তেলের দাম কমার সম্ভাবনা কম।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধে ইরানকে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করার শর্ত দিয়েছে, যার বিনিময়ে ইরান পাবে ২০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ইরান যদি তাদের ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করে তাহলে তারা চিরকালের জন্য অস্ত্র শক্তিতে পঙ্গু হয়ে পড়বে এবং আমেরিকার দাসে পরিণত হবে। তাই ইরান কোনোভাবেই এই শর্ত মেনে নিবে না।

সুতরাং যুদ্ধ আবারো শুরু হবার সম্ভাবনাই সব থেকে বেশি। এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও নাগরিকদের জীবনে নেমে আসছে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ। পর্যাপ্ত খাদ্যদ্রব্যের অভাবে নয় বরং জ্বালানি তেল সংকটের প্রভাবে। কারণ দেশের মোট জ্বালানির ৯৫% আমদানিকৃত, তাই সব খাতে সরাসরি আঘাত এসে লাগছে। যার ফলে দেশের নিম্ন আয়ের মানুষগুলোর খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে হুমকির মুখে পড়ছে। আর নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষদের বেঁচে থাকাটা রুদ্ধশ্বাসে রূপ নিচ্ছে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টারা বারবার দাবি করছেন দেশে কোনো জ্বালানির সংকট নেই। কিন্তু সারা দেশের পেট্রোল পাম্পগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ লাইন। রাস্তার পাশে সারি সারি মোটরসাইকেল, ট্রাক সহ অন্যান্য তেল চালিত গাড়িগুলো নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছেন সাধারণ মানুষ। এই ফাঁকে সিটের উপরেই ট্রাক ড্রাইভাররা ঘুমিয়ে নিচ্ছেন। কোথাও আবার এক-দেড় কিলোমিটার দূর ছাড়িয়ে গিয়েছে লাইনের পরিধি। পাম্পের তেল শেষ হওয়ায় লাইন থেকে অনেকেই হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। কৃষক কার্ড হাতে নিয়ে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ছুটছেন কৃষক, কিন্তু তবুও মিলছে না তেল।পাম্প থেকে তেল নেওয়াকে ঘিরে ছোট-বড় সংঘাতের ঘটনা ঘটতে দেখা যাচ্ছে। এমন সব পরিস্থিতিতে বাস্তবিকভাবে প্রকাশ পাচ্ছে জ্বালানি সংকটের ভয়াবহ চিত্র। তাছাড়া তেলের সংকট যদি না-ই থাকতো, যদি ব্যবসায়িক ও অন্যান্যরা অতিরিক্ত তেল মজুদ করে রাখার মতো বিষয়ে জড়িত থাকতো, তাহলে সেই তেলটা কোথায় মজুদ আছে? সেটা খুঁজে বের করা এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। অথচ এই ধরনের খবরও আমরা পাচ্ছি না। তাই উপদেষ্টাদের এমন তথ্য বা মতামতকে জনমানুষের কাছে ভিত্তিহীন করে তুলছে।

কৃষক কার্ড হাতে নিয়ে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ছুটছেন কৃষক। বর্তমান পরিস্থিতিতে ফসল চাষ নিয়ে তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। কারণ জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিংয়ের কারণে সেচের অভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি। আরেক দিকে দেশে নতুন করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ট্রান্সফরমার ডাকাতির ঘটনা। সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায়, একটি চক্র প্রথমে চাঁদা চেয়েছিলেন কিন্তু গভীর নলকূপের মালিকরা চাঁদা দিতে আপত্তি করেন। তাই মালিক ও চালকদের বেঁধে রেখে মারধর করা হয়, এরপর ট্রান্সফরমারের ভেতরের মূল্যবান কয়েল লুট করে নিয়ে যায় চক্রটি।

দৈনিক ৮০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ডিএপি কারখানা অ্যামোনিয়ার গ্যাসের অভাবে এখন বন্ধ হয়ে গেছে।এর ফলে শস্যের ফলনের পথে ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এতে কৃষকদের উচ্চ দামে ইউরিয়া সার কিনতে হতে পারে। দেখা যেতে পারে পাম্পের মতো সারের দোকানে ইউরিয়া সংকটে দীর্ঘ লাইন।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে ইতিমধ্যেই পরিবহন ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে। যানবাহন ভাড়া বৃদ্ধি হওয়ার সাথে সাথে বিভিন্ন জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে। ভোক্তাদের দৈনন্দিনের বাজারে অতিরিক্ত দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে খাদ্যদ্রব্য। এখানে প্রান্তিক কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন না, ব্যাপকভাবে লাভবান হচ্ছেন ব্যবসায়ী শ্রেণী। সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছে, পোলাও চালের দাম অঞ্চল ভেদে কেজি প্রতি পাঁচ থেকে পনেরো টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন অস্বাভাবিক বাজারই বলে দেয় অন্যান্য জিনিসপত্রের দাম কেমন হচ্ছে বা কেমন হতে চলেছে।

প্রতিদিন প্রায় ২,০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ঘাটতিতে লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে সারাদেশ। চব্বিশ ঘন্টার আট ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও আবার দিন-রাতের ১৬ ঘন্টাই কারেন্টের দেখা মিলছে না।এতে করে বিদ্যুৎ নির্ভর শিল্প-কারখানাগুলোর মালিক ও কর্মচারীরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। সময় এবং পর্যাপ্ত কাজ না হওয়ার ফলে কর্মচারী ও শ্রমিকদের মাসিক বেতন কম পাওয়া বা মালিক শ্রেণীর নিকট বেতন আটকে থাকার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া বিদ্যুৎ চালিত পরিবহনে এই মুহূর্তে যাতায়াত ভাড়া বৃদ্ধি পাচ্ছে। বড়পুকুরিয়ার দৈনিক ১২৫ মেগাওয়াট ও কাপ্তাই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতো। গতকাল ইউনিট দুটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছে, যান্ত্রিক ত্রুটি ও কর্ণফুলী নদীর পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে নিচে নামার ফলে দেশের দুটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক সার্বিক পরিস্থিতি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের নাগরিকদের জীবনে হাঁসফাঁস অবস্থা সৃষ্টি করে ছাড়ছে। বিশেষ করে যারা অল্প বেতনের চাকুরী করেন তাদের বেতন আর বর্তমান বাজার দর মাস শেষের হিসেবে এক অস্বাভাবিক মাত্রা তৈরি করবে। যারা দূর-দূরান্তে চাকুরী করেন, ভাড়া বাসায় থাকেন— অন্যান্য জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়তি বাড়ি ভাড়া বহন করতে হচ্ছে। প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াত বাবদ তাদের অতিরিক্ত টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে।

বাজারে বিভিন্ন জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে বর্তমান অব্দি গ্যাস সিলিন্ডার লাগামহীন দামে খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত দাম জনগণের কাছে বিদ্রুপ ছাড়া আর কিছুই নয়। বর্তমান সরকারও এই বিষয়ে নিরবতা পালন করে যাচ্ছেন। যার ফলে বারো কেজি এলপিজি সিলেন্ডারের দাম ২ হাজার থেকে ২২শ’ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে।

দেশের সংকটের বিষয়টা জনগণের আড়ালে রাখতেই সম্ভবত গুপ্ত  এবং লন্ডন নামক শব্দটিকে নিয়ে রাজনৈতিকভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হচ্ছে। যাতে জনগণের পুরোপুরি মনযোগ এইদিকে ফেরানো যায়। তবে এভাবে জনগণকে খুব বেশি দিন রাজপথ থেকে দূরে সড়িয়ে রাখা সম্ভব হবে না। জন জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠলে স্বাভাবিকভাবেই জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়বে। তখন দেশের বিক্ষুব্ধ নাগরিকরা রাজপথে নামতে বাধ্য হবে। এই মুহূর্তে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে অতি দ্রুত সংকট নিরসন করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।

সোয়েব মোহাম্মাদ 
তরুণ লেখক ও কবি 
[email protected]

*মতামত লেখকের নিজস্ব

 

ঢাকা এক্সপ্রেস/ইউকে

আরও পড়ুন