ঢাকা, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

১৯ আশ্বিন ১৪৩৩, ২১ রবিউস সানি ১৪৪৮

ইসলামের রাজনীতি: ক্ষমতার লড়াই, নাকি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ?

ধর্ম ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮:৪৮, ৬ আগস্ট ২০২৬

ইসলামের রাজনীতি: ক্ষমতার লড়াই, নাকি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ?

ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস

রাজনীতি শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে নির্বাচন, ক্ষমতা, দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা সংসদের উত্তপ্ত বিতর্ক। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে রাজনীতি কি শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের একটি উপায়? নাকি এর লক্ষ্য আরও গভীর—মানুষের অধিকার রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জনকল্যাণ নিশ্চিত করা?

ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের সূচনা হয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। সেখানে ধর্মীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি তিনি ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক ও সমাজসংগঠক। তবে তাঁর শাসনের মূল ভিত্তি ছিল ন্যায়বিচার, পরামর্শ এবং মানুষের কল্যাণ। ক্ষমতা ছিল দায়িত্ব, বিশেষ সুবিধা নয়।

কুরআনে বারবার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ এসেছে। এমনকি নিজের বা নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধে গেলেও সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তায় তাই শাসকের প্রথম পরিচয় একজন জবাবদিহিমূলক অভিভাবক, যিনি জনগণের সেবক।

নবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম সমাজে নেতৃত্বের দায়িত্ব নেন খোলাফায়ে রাশেদীন। তাঁদের শাসনামলকে অনেক ইসলামী চিন্তাবিদ আদর্শ রাষ্ট্র পরিচালনার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। কারণ সেখানে শাসকের ব্যক্তিগত জীবন ছিল সাধারণ মানুষের মতোই সরল, আর রাষ্ট্র পরিচালনায় ছিল পরামর্শ, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির চর্চা।

তবে ইসলামের রাজনীতি শুধু অতীতের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক বিশ্বে এটি নিয়ে রয়েছে বিস্তর আলোচনা ও মতভেদ। কেউ মনে করেন, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হওয়ায় রাষ্ট্রও ইসলামী আইন অনুযায়ী পরিচালিত হওয়া উচিত। অন্যদিকে অনেকে বলেন, ইসলামের মূল লক্ষ্য হলো ন্যায়, মানবিকতা ও জনকল্যাণ প্রতিষ্ঠা; রাষ্ট্রের কাঠামো সময় ও সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে, যদি তা ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধের পরিপন্থী না হয়।

এ কারণেই আজ বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে শাসনব্যবস্থার ধরন এক নয়। কোথাও সাংবিধানিক রাজতন্ত্র, কোথাও প্রজাতন্ত্র, কোথাও সংসদীয় গণতন্ত্র—আবার কোথাও ইসলামী আইনকে বিভিন্ন মাত্রায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে "ইসলামী রাজনীতি" বলতে একটি মাত্র মডেল বোঝায়—এমন দাবি করা কঠিন।

ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের কয়েকটি মৌলিক নীতি প্রায় সব ধারার চিন্তাবিদই গুরুত্ব দেন। এর মধ্যে রয়েছে শুরা (পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত), আদল (ন্যায়বিচার), আমানত (ক্ষমতাকে দায়িত্ব হিসেবে দেখা), জবাবদিহি এবং মাসলাহা (জনস্বার্থ)।

সমসাময়িক বিশ্বে ইসলামের রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক যেমন রয়েছে, তেমনি গবেষণাও বাড়ছে। একদিকে ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষা, অন্যদিকে আধুনিক রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও বহুত্ববাদ—এই বিষয়গুলোর সমন্বয় কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে মুসলিম বুদ্ধিজীবী, আলেম ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিকদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ক্ষমতা নয়, বরং ন্যায়বিচার ও জনকল্যাণ। বাস্তবে সেই আদর্শ কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়, তা নির্ভর করে শাসক, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সম্মিলিত ভূমিকার ওপর। তাই ইসলামের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা মানেই কেবল ক্ষমতার প্রশ্ন নয়; এটি নৈতিকতা, দায়িত্ব, সুশাসন এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নও। 

ঢাকা এক্সপ্রেস/এসআই

আরও পড়ুন