ঢাকা, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

১৯ আশ্বিন ১৪৩৩, ২১ রবিউস সানি ১৪৪৮

কর্মক্ষেত্রে সততা: ইসলাম কী বলে?

ধর্ম ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫:১৩, ৮ আগস্ট ২০২৬

কর্মক্ষেত্রে সততা: ইসলাম কী বলে?

ছবি: ঢাকা এক্সপ্রেস

কর্মক্ষেত্রে একজন মানুষের পরিচয় শুধু তার পদবি কিংবা বেতন দিয়ে তৈরি হয় না। তার আচরণ, দায়িত্ববোধ এবং সততাই তৈরি করে প্রকৃত পরিচয়। একজন কর্মী কতটা দক্ষ, তার পাশাপাশি তিনি কতটা সৎ—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামে সততাকে মানুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি কিংবা যেকোনো দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও সত্যবাদিতা ও আমানতদারিতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

দায়িত্ব একটি আমানত

কর্মক্ষেত্রে একজন মানুষ যে দায়িত্ব পান, সেটি ইসলামী দৃষ্টিতে এক ধরনের আমানত। দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা, ইচ্ছাকৃতভাবে কাজে ফাঁকি দেওয়া কিংবা নিজের দায়িত্ব অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই আমানতের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কোরআনে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে।”
—সূরা আন-নিসা: ৫৮

এই শিক্ষা শুধু অর্থ বা সম্পদের ক্ষেত্রে নয়; কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব, সময় ও কর্তব্যের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক।

অফিসের সময়ও দায়িত্বের অংশ

কর্মজীবনে সময়ের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়াও সততার একটি অংশ। অফিসে উপস্থিত থেকে ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকা, ইচ্ছাকৃতভাবে কাজ ফেলে রাখা কিংবা দায়িত্ব পালনের সময় অন্য কাজে সময় নষ্ট করা কর্মদায়িত্বের প্রতি অবহেলা।

একজন সৎ কর্মী বুঝতে পারেন—প্রতিষ্ঠান তাকে যে সময়ের জন্য নিয়োগ দিয়েছে, সেই সময়টিও তার দায়িত্বের অংশ।

মিথ্যা ও প্রতারণা নয়

কাজে ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ভুল লুকানোর জন্য মিথ্যা বলা, তথ্য গোপন করা কিংবা অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া ইসলামের নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সততার অর্থ হলো ভুল হলে তা স্বীকার করা এবং সংশোধনের চেষ্টা করা। এতে হয়তো সাময়িকভাবে বিব্রত হতে হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তৈরি হয় বিশ্বাসযোগ্যতা।

ঘুষ ও অনৈতিক সুবিধা

কর্মক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য ঘুষ গ্রহণ, অবৈধ উপহার নেওয়া কিংবা নিজের অবস্থান ব্যবহার করে অন্যায় সুবিধা আদায় ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অনৈতিক কাজ।

একজন দায়িত্বশীল কর্মীর কাছে পদ বা ক্ষমতা ব্যক্তিগত লাভের মাধ্যম নয়। বরং এটি মানুষের অধিকার রক্ষা এবং নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের সুযোগ।

অন্যের প্রাপ্য আত্মসাৎ নয়

কর্মক্ষেত্রে সততা শুধু নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সহকর্মীর কাজের কৃতিত্ব নিজের নামে নেওয়া, কারও প্রাপ্য পারিশ্রমিক আটকে রাখা কিংবা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করাও সততার পরিপন্থী।

ইসলামের শিক্ষা হলো—অন্যের অধিকার যথাযথভাবে আদায় করা। কারণ কোনো মানুষের অধিকার নষ্ট করে ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জন প্রকৃত সাফল্য হতে পারে না।

কাজে ইহসান বা উৎকর্ষ

ইসলামী নৈতিকতায় শুধু দায়িত্ব পালন করাই যথেষ্ট নয়; দায়িত্বটি সুন্দরভাবে পালন করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ একজন কর্মী তার কাজের প্রতি আন্তরিক হবেন এবং সর্বোচ্চ দক্ষতা দিয়ে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করবেন।

কাজ ছোট কিংবা বড়—দায়িত্বের প্রতি আন্তরিকতাই একজন মানুষের চরিত্র প্রকাশ করে।

সততার মূল্য কোথায়?

কর্মক্ষেত্রে অসততা কখনো কখনো দ্রুত সুবিধা এনে দিতে পারে। কিন্তু এতে নষ্ট হয় মানুষের আস্থা। একজন অসৎ কর্মী হয়তো সাময়িকভাবে লাভবান হতে পারেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে হারাতে পারেন সহকর্মী, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের বিশ্বাস।

অন্যদিকে একজন সৎ মানুষ ধীরে এগোলেও তার ওপর তৈরি হয় আস্থা। তার কথা বিশ্বাস করা যায়, দায়িত্ব দেওয়া যায় এবং সংকটে তার ওপর নির্ভর করা যায়।

ইসলামের দৃষ্টিতে কর্মক্ষেত্র তাই শুধু জীবিকা অর্জনের জায়গা নয়; এটি নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধেরও পরীক্ষা। একজন মানুষ তার কাজের মাধ্যমে যেমন উপার্জন করেন, তেমনি তার চরিত্রেরও প্রকাশ ঘটান।

সততা মানে শুধু মিথ্যা না বলা নয়। সততা মানে নিজের দায়িত্বকে আমানত মনে করা, অন্যের অধিকার রক্ষা করা, প্রতারণা থেকে দূরে থাকা এবং কাজের প্রতি আন্তরিক থাকা।

কর্মক্ষেত্রে এই মূল্যবোধগুলো প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু একজন কর্মী নয়, একটি প্রতিষ্ঠানও লাভবান হয়। আর যখন ব্যক্তিগত সততা ও পেশাগত দায়িত্ববোধ একসঙ্গে কাজ করে, তখন কর্মক্ষেত্র হয়ে ওঠে আস্থা, ন্যায় ও দায়িত্বশীলতার জায়গা।

ঢাকা এক্সপ্রেস/এসআই

আরও পড়ুন